‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে বড়সড় পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকগত কারণে কোনও ব্যক্তি জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে না চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি পদক্ষেপ করা উচিত নয়—মঙ্গলবার এমনই মত প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত। যদিও আদালত এখনও চূড়ান্ত রায় দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কেন্দ্রকে দু’সপ্তাহের মধ্যে নিজেদের অবস্থান জানাতে বলা হয়েছে। ফলে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং তা না মানলে শাস্তির বিধান—এই দুই প্রশ্নকে ঘিরে আইনি বিতর্ক আপাতত আরও গভীর হল।
এই মামলার সূত্রপাত বিশিষ্ট কর্ণাটকী সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণের করা একটি আবেদনের মাধ্যমে। ২০২৬ সালে জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনে যে সংশোধন আনা হয়েছে, তার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক গাওয়া বা না গাওয়াকে ফৌজদারি আইনের আওতায় নিয়ে আসা হলে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘাত তৈরি হতে পারে। সেই সংশোধনীর কয়েকটি বিধানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার এই মামলার শুনানিতে বিচারপতিরা বিশেষভাবে জানতে চান, কোনও ব্যক্তি যদি তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকের কারণে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে অস্বীকার করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কীভাবে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে যে এই পর্যায়ে তারা ‘বন্দে মাতরম’-এর কতগুলি স্তবক গাওয়া উচিত বা সম্পূর্ণ গান গাওয়া বাধ্যতামূলক কি না—সেই প্রশ্নে চূড়ান্ত মত দিচ্ছে না। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, গান না গাওয়ার জন্য একজন নাগরিককে অপরাধী করা যায় কি না।
এই মামলায় সংবিধানের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের সংবিধান নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিবেকের স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ কোনও আচরণ করতে অস্বীকার করলে রাষ্ট্র কতটা তাকে বাধ্য করতে পারে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আইনি আলোচনা রয়েছে। ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কেও সেই একই প্রশ্ন সামনে এসেছে—দেশের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি কি আইনের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের উপর বাধ্যতামূলক করা যায়?
সুপ্রিম কোর্টের মঙ্গলবারের শুনানিতে ১৯৮৬ সালের **Bijoe Emmanuel** মামলার প্রসঙ্গও উঠে আসে। সেই মামলায় জেহোভা’স উইটনেস সম্প্রদায়ের কয়েকজন স্কুলছাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকার করেছিল। তবে তারা জাতীয় সংগীত চলাকালীন সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিরোধিতা করেছিল। বর্তমান মামলাতেও সেই রায়ের নীতির প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
এই পুরনো রায়ের উল্লেখ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সেখানে আদালত মূলত বলেছিল, কোনও নাগরিকের বিবেক ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে অযথা বাধ্য করা যাবে না। একজন ব্যক্তি কোনও জাতীয় প্রতীকের প্রতি অসম্মান না দেখিয়েও সেটি গাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন—এই নীতিই বর্তমান বিতর্কে আবার সামনে এসেছে। তবে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বর্তমান আইন এবং ১৯৮৬ সালের মামলার পরিস্থিতি এক নয়। তাই পুরনো রায়ের নীতি কতটা এবং কীভাবে বর্তমান আইনে প্রযোজ্য হবে, সেটিই আগামী শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
টি এম কৃষ্ণের আবেদনে মূলত ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি স্তবক গাওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গানটির পরবর্তী স্তবকগুলিতে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক ও দেবদেবীর উল্লেখ রয়েছে। আবেদনকারীর যুক্তি, সেই অংশগুলি কোনও কোনও ধর্মের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই প্রত্যেক নাগরিককে সম্পূর্ণ গান গাইতে বাধ্য করা হলে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ‘বন্দে মাতরম’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়েও কোনও বিতর্ক নেই। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত এই গান ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গানটি জাতীয়তাবাদী আবেগ জাগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্বাধীনতার পর ‘জন গণ মন’-এর পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দেওয়া হয়। ফলে দেশের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে গানটির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
কিন্তু জাতীয় মর্যাদা থাকা এবং প্রতিটি নাগরিককে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গানটি গাইতে বাধ্য করা—এই দুই বিষয়কে আদালত আলাদা করে দেখছে। জাতীয় সংগীত বা জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান দেখানোর প্রশ্নের সঙ্গে একজন ব্যক্তির গান গাওয়ার স্বাধীনতা এক নয়। একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে পারেন, কিন্তু নিজের ধর্মীয় বা বিবেকগত বিশ্বাসের কারণে গান না-ও গাইতে পারেন কি না, সেটিই এখন আইনি প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে।
এখানেই ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশোধনের মাধ্যমে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় গানের প্রতি অবমাননা, গানে বাধা দেওয়া বা গানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার মতো আচরণকে আরও কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগের সীমা কতটা, তা নিয়েই এখন সুপ্রিম কোর্টের সামনে প্রশ্ন উঠেছে।
আদালতের মঙ্গলবারের পর্যবেক্ষণ থেকে আপাতত যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল—কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় গানের অবমাননা করেন, তাহলে সেই আচরণ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে গান না গাওয়াকে এক করে দেখা যাবে না। অর্থাৎ গান গাইতে অস্বীকার করা এবং গানকে অপমান করা—দুটি আলাদা বিষয়। আদালত এই পার্থক্যের দিকেই বিশেষ নজর দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পার্থক্য ভবিষ্যৎ আইনি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনও অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হলে একজন ব্যক্তি যদি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং কোনও ধরনের অবমাননাকর আচরণ না করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যাবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরই সম্ভবত মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল নির্ধারণ করবে।
অন্যদিকে, সরকারের যুক্তিও এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা এবং দেশাত্মবোধের বিষয়টি তুলে ধরা হতে পারে। সরকারের বক্তব্য হতে পারে, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় গানের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার জন্য আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সুরক্ষা প্রয়োগের সময় যেন ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা বা বিবেকের স্বাধীনতা অকারণে লঙ্ঘিত না হয়—সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ সেই সীমারেখাটিকেই সামনে এনেছে।
এই বিতর্ক ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়েছে। বিশেষ করে ‘বন্দে মাতরম’-এর কতগুলি স্তবক সরকারি অনুষ্ঠানে গাওয়া হবে, তা নিয়েও বিভিন্ন রাজ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। কর্নাটকে সরকারি অনুষ্ঠানে প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার নির্দেশকে কেন্দ্র করে বিজেপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর হয়েছে। বিরোধীরা সম্পূর্ণ গান গাওয়ার দাবি জানিয়েছে, অন্যদিকে রাজ্য সরকার প্রথম দুই স্তবকের নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ফলে সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান মামলাটি শুধু একজন শিল্পীর আবেদনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা, দেশপ্রেম প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, ‘বন্দে মাতরম’ না গাওয়ার ক্ষেত্রে যদি সরাসরি অপরাধের মামলা করা না যায়, তাহলে জাতীয় গানের অবমাননার সীমা কোথায় নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ কোনও ব্যক্তি যদি গান না গান, কিন্তু অসম্মানও না করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে গানকে অপমান করেন বা অন্যদের গান গাওয়ায় বাধা দেন, তাহলে সেই আচরণ কীভাবে আইনের আওতায় আসবে—সেটিও ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যার বিষয়।
এই কারণে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। মঙ্গলবার আদালত কেন্দ্রের কাছে জবাব চেয়েছে এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েছে। এরপর আবেদনকারীর বক্তব্য, কেন্দ্রের জবাব এবং সংশ্লিষ্ট আইনের সাংবিধানিক বৈধতা বিশ্লেষণ করে আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এখনও পর্যন্ত আদালত ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক কি না, অথবা ছয়টি স্তবকই গাইতে হবে কি না—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। তাই মঙ্গলবারের পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আদালত মূলত ধর্মীয় বা বিবেকগত কারণে গান না গাওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে তার প্রত্যাশা জানিয়েছে এবং কেন্দ্রের বক্তব্য চেয়েছে।
সব মিলিয়ে, ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে চলা আইনি বিতর্ক এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক আলোচনায় পরিণত হয়েছে। একদিকে রয়েছে জাতীয় গানের ঐতিহাসিক মর্যাদা ও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক, অন্যদিকে রয়েছে নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার। সুপ্রিম কোর্টের মঙ্গলবারের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে দেশপ্রেমের প্রতি সম্মান এবং কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিশ্বাস—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। এখন কেন্দ্রের জবাবের পর মামলাটি কোন দিকে এগোয়, সেদিকেই নজর দেশের।


