স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর জাতির উদ্দেশে ভাষণ ঘিরে তৈরি হল এক বিশেষ মুহূর্ত। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্প্রচারের আগে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করা হয়। ভাষণ শেষ হওয়ার পরও ফের বাজানো হয় জাতীয় গানটি। এরপর পরিবেশিত হয় জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’। ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসের আবহে এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ চলতি বছর ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ সাধারণত স্বাধীনতা দিবসের আগের সন্ধ্যায় দেশের উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে সম্প্রচারিত হয়। কিন্তু এবার ভাষণ সম্প্রচারের আগে ও পরে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের কারণে অনুষ্ঠানটির সূচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়। সম্পূর্ণ জাতীয় গান পরিবেশনের পর জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়।
এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে ‘বন্দে মাতরম’-কে ঘিরে সাম্প্রতিক সরকারি সিদ্ধান্ত। ২০২৬ সালে জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ আইনে সংশোধনের মাধ্যমে জাতীয় গানটিকে জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে সমপর্যায়ের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সংশ্লিষ্ট বিলে সম্মতি দেওয়ার পর ‘বন্দে মাতরম’-এর ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা পরিবেশনে বাধা দেওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার ফলে সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে ‘বন্দে মাতরম’-এর পরিবেশনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রোটোকল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যখন জাতীয় গান এবং জাতীয় সঙ্গীত একই অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে, তখন ‘বন্দে মাতরম’ আগে এবং ‘জন গণ মন’ পরে পরিবেশনের নির্দেশ রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে ও পরে জাতীয় গান পরিবেশনের ঘটনাও সেই নতুন প্রোটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শুক্রবারের অনুষ্ঠানটির আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এবার ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ সংস্করণ পরিবেশন করা হয়েছে। এতদিন সাধারণত জাতীয় গানের প্রথম দুটি স্তবকই বেশি পরিচিত ছিল। কিন্তু চলতি বছর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্পূর্ণ গানকে সামনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে নির্দিষ্ট ছয়টি স্তবক পরিবেশনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘বন্দে মাতরম’-এর ইতিহাস ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনা থেকে উঠে আসা এই গান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় জাতীয়তাবাদী আবেগ জাগিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পরবর্তীকালে এটি ভারতের জাতীয় গান হিসেবে মর্যাদা পায়। রাষ্ট্রপতি মুর্মুও তাঁর স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালের ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘বন্দে মাতরম’-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্মরণ করেন।
এবারের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানেও ‘বন্দে মাতরম’কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৫ আগস্ট লালকেল্লার স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো জাতীয় সঙ্গীতের আগে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই বিশেষ ক্রম অনুসরণ করা হবে।
এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ২০২৬ সালে ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তির বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। জাতীয় গানটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সামনে রেখে এ বছর দেশজুড়ে নানা সাংস্কৃতিক ও সরকারি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ বাজানোকে সেই বৃহত্তর উদযাপনেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে ‘বন্দে মাতরম’ বাজানোর ঘটনাটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক—দুই দিক থেকেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে এর মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামে গানটির ঐতিহাসিক অবদান এবং জাতীয় চেতনায় তার ভূমিকা তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় গানটির আইনি মর্যাদা, সরকারি অনুষ্ঠানে তার ব্যবহার এবং জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীতের ভূমিকা অবশ্য আলাদা। ‘জন গণ মন’ ভারতের জাতীয় সঙ্গীত, আর ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গান। তবে নতুন আইনি সুরক্ষা এবং সরকারি অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট প্রোটোকলের ফলে দুটির আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে ‘বন্দে মাতরম’ এবং পরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের ঘটনা সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
রাষ্ট্রপতি মুর্মুর বক্তব্যেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয় ঐক্য এবং ভবিষ্যতের ভারতের লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। তিনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশের কঠোর অবস্থান, ‘অপারেশন সিঁদুর’, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন। ফলে ভাষণের আগে ও পরে জাতীয় প্রতীকসম্মত গান পরিবেশনের বিষয়টি তাঁর বক্তব্যের সামগ্রিক দেশাত্মবোধক আবহকে আরও জোরালো করেছে।
এবারের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানগুলিতে ‘যুবশক্তি’-কেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। লালকেল্লার মূল অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মের সাফল্য এবং অবদানকে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে ভারতের উন্নয়নযাত্রা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আত্মনির্ভরতার বার্তাও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে চলেছে।
তবে ‘বন্দে মাতরম’কে ঘিরে সব জায়গায় যে বিতর্ক নেই, তা নয়। বিভিন্ন রাজ্য ও সংগঠনের মধ্যে জাতীয় গানটির বাধ্যতামূলক পরিবেশন নিয়ে মতপার্থক্যও দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপটে সরকারি অনুষ্ঠানে গানটির ব্যবহার কীভাবে হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
তার মধ্যেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে ও পরে সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য নজির। জাতীয় গানটির ১৫০ বছর পূর্তির বছরে এই সিদ্ধান্তের প্রতীকী গুরুত্ব আরও বেড়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, জাতীয় পরিচয় এবং আধুনিক ভারতের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে একটি যোগসূত্র তৈরি করার চেষ্টা হিসেবেও বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ১৪ আগস্ট রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর জাতির উদ্দেশে ভাষণের আগে ‘বন্দে মাতরম’ বাজানো এবং ভাষণ শেষে ফের গানটি পরিবেশন করা ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। এরপর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। জাতীয় গানটির ১৫০ বছর পূর্তি এবং নতুন আইনি সুরক্ষার প্রেক্ষাপটে এই নতুন আনুষ্ঠানিকতা আগামী দিনে সরকারি অনুষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।


