দুর্গাপুজো মানেই নতুন জামাকাপড়, প্যান্ডেল হপিং, আলোর ঝলকানি এবং অভিনব থিমের টান। প্রতি বছরই বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের পুজো উদ্যোক্তারা দর্শনার্থীদের চমক দিতে নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে হাজির হন। এবার সেই তালিকায় বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে চলেছে বর্ধমানের একটি দুর্গাপুজো। সেখানে প্রতিমা দর্শনের জন্য দর্শনার্থীদের উঠতে হবে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে। শুধু ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতাই নয়, মণ্ডপে প্রবেশ করলেই মিলবে কাশ্মীর বা ‘ভূস্বর্গ’-এর আবহ। অর্থাৎ এক পুজোমণ্ডপেই বন্দে ভারত সফর এবং কাশ্মীর ভ্রমণের অনুভূতি—দুইয়ের স্বাদ পাবেন দর্শনার্থীরা।
বর্ধমানের সুভাষ অ্যাথলেটিক ক্লাব পরিচালিত অরবিন্দ পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসব এবারের পুজোয় এই অভিনব পরিকল্পনা নিয়েছে। নারী কলোনির ৭৬তম বর্ষের পুজোর থিম রাখা হয়েছে—‘বাহন বন্দে ভারত ভূস্বর্গে মা’। থিমের নাম থেকেই স্পষ্ট, এবারের পুজোয় বন্দে ভারত ট্রেনকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে সম্পূর্ণ মণ্ডপসজ্জা। তার সঙ্গে যুক্ত হবে কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বরফে ঢাকা পাহাড়ি পরিবেশের ভাবনা।
পুজো কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, মণ্ডপে প্রবেশের আগে দর্শনার্থীদের একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে বন্দে ভারত ট্রেনে উঠতে হবে। সেই ট্রেনেই চেপে তাঁরা পৌঁছবেন প্রতিমা দর্শনের গন্তব্যে। পুজো উদ্যোক্তাদের দাবি, গোটা ব্যবস্থাটি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে দর্শনার্থীদের মনে হয় তাঁরা সত্যিই একটি ট্রেনে সফর করছেন। পিচরাস্তায় রেললাইন বসিয়ে তার উপর দাঁড় করানো হবে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের আদলে তৈরি ট্রেন। সেই রেলপথের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২৫০ মিটার।
জানা গিয়েছে, মণ্ডপ থেকে প্রায় ২৫০ মিটার দূরে একটি স্টেশন ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে। সেখান থেকেই দর্শনার্থীরা ট্রেনে উঠবেন। এরপর ট্রেনের মাধ্যমে তাঁরা মণ্ডপের সামনে তৈরি করা অন্য একটি স্টেশনে পৌঁছবেন। এই গোটা পথ চলার অভিজ্ঞতাকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলতে থাকবে রেললাইন, প্ল্যাটফর্ম এবং স্টেশনের নানা উপকরণ। ফলে মণ্ডপে যাওয়ার পথটিও হয়ে উঠবে পুজোর অন্যতম আকর্ষণ।
ট্রেনটিতে মোট তিনটি কম্পার্টমেন্ট থাকবে। এর মধ্যে দুটি থাকবে সাধারণ বা জেনারেল কামরা এবং একটি থাকবে ভিআইপি কম্পার্টমেন্ট। দর্শনার্থীদের জন্য ট্রেনের ভিতরের সাজসজ্জাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের বাস্তব চেহারার সঙ্গে মিল রেখে ট্রেনটি তৈরি করা হবে বলে জানিয়েছেন পুজো কমিটির কর্মকর্তারা। তাঁদের বক্তব্য, ট্রেনটি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে দূর থেকে দেখলে আসল বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের সঙ্গে তেমন পার্থক্য বোঝা না যায়।
শুধু ট্রেনেই শেষ নয়, মণ্ডপের ভিতরেও থাকবে আরও চমক। সেখানে তৈরি করা হবে বরফের দেশ বা কাশ্মীরের আবহ। তুষারঢাকা পাহাড়, ঠান্ডা পরিবেশ এবং ভূস্বর্গের অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা থাকবে মণ্ডপসজ্জায়। ফলে ট্রেনে চেপে মণ্ডপে পৌঁছনোর পর দর্শনার্থীরা যেন কাশ্মীরের কোনও পর্যটনস্থলে এসে হাজির হয়েছেন, এমন অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। প্রতিমা দর্শনের সঙ্গে থিমের পরিবেশও পুজোপ্রেমীদের আকর্ষণ করবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এই অভিনব ভাবনার মূল পরিকল্পনা করেছেন অনুভব ঘোষ। তাঁর পরিকল্পনাতেই মণ্ডপসজ্জার কাজ এগিয়ে চলছে। পুজো কমিটির সম্পাদক অঙ্কন গুহ জানিয়েছেন, দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য। সাধারণ প্যান্ডেল হপিংয়ের বাইরে এবার মানুষ যাতে মণ্ডপে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই একটি গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারেন, সেই ভাবনা থেকেই বন্দে ভারত এবং কাশ্মীরকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
পুজো কমিটির আর এক কর্মকর্তা কিংশুক ঘোষ জানিয়েছেন, ট্রেনের নকশা এবং নির্মাণে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের আদল বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ট্রেনের কামরা, প্ল্যাটফর্ম এবং স্টেশন—সবকিছুতেই বাস্তবতার ছাপ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দর্শনার্থীরা ট্রেনে ওঠার পর যেন একটি ছোট্ট যাত্রার অনুভূতি পান, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিশু থেকে বয়স্ক—সব বয়সের মানুষের কাছেই এই আয়োজন আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে বলে আশা উদ্যোক্তাদের।
জানা গিয়েছে, এই বিশেষ বন্দে ভারত ট্রেন তৈরি করতে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা থেকে শিল্পীদের আনা হবে। পুজোর আলোকসজ্জার দায়িত্বও থাকবে ওই এলাকার শিল্পীদের হাতে। ট্রেনের পাশাপাশি আলো, শব্দ এবং মণ্ডপের পরিবেশের মাধ্যমে পুরো থিমকে আরও জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করা হবে। কাশ্মীরের আবহ তৈরি করতে মণ্ডপের ভিতরে বরফের মতো সাজসজ্জা এবং পাহাড়ি পরিবেশ ফুটিয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্ধমান শহরে একাধিক বড় এবং জনপ্রিয় দুর্গাপুজো থাকলেও, অরবিন্দ পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এই থিম ইতিমধ্যেই আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। পুজোর আগে থেকেই মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। রেললাইন বসানো, প্ল্যাটফর্ম তৈরি, ট্রেনের কাঠামো দাঁড় করানো এবং কাশ্মীরের পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। পুজোর দিনগুলিতে এই মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়বে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।
বাংলার দুর্গাপুজোয় থিমের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কখনও ঐতিহাসিক স্থাপত্য, কখনও সামাজিক বার্তা, কখনও বা দেশ-বিদেশের কোনও বিশেষ জায়গাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ তৈরি করা হয়। সেই ধারাতেই এবার বর্ধমানে বন্দে ভারত ট্রেন এবং কাশ্মীরকে একসঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে। একদিকে আধুনিক ভারতের দ্রুতগতির ট্রেন, অন্যদিকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল কাশ্মীর—এই দুই ভাবনাকে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে পুজোর মূল концеп্ট।
উদ্যোক্তাদের আশা, পুজোর দিনগুলিতে অরবিন্দ পল্লির এই মণ্ডপ দর্শনার্থীদের মনে বিশেষ জায়গা করে নেবে। ট্রেনে চেপে মণ্ডপে পৌঁছনোর অভিজ্ঞতা যেমন নতুনত্ব আনবে, তেমনই কাশ্মীরের আবহ প্রতিমা দর্শনকে আরও স্মরণীয় করে তুলবে। পুজোর আনন্দের সঙ্গে ভ্রমণের অনুভূতি যুক্ত করাই এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য। তাই এবারের দুর্গাপুজোয় বর্ধমানের অরবিন্দ পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসব যে দর্শনার্থীদের নজর কাড়তে চলেছে, তা বলাই যায়।


