বিশ্বকর্মা পুজোর পরেই কলকাতা শহরের রাস্তা সংস্কারের কাজে জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলকাতা পুরসভা। বর্ষার দাপটে মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও আবার জল জমে রাস্তার পিচ উঠে গিয়েছে। ফলে প্রতিদিন যাতায়াত করতে গিয়ে চরম সমস্যার মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। পুজোর আগে শহরের রাস্তা মেরামতির কাজ শেষ করার জন্য এবার তৎপর হচ্ছে পুরপ্রশাসন।
পুরসভা সূত্রে খবর, বিশ্বকর্মা পুজোর পর শহরজুড়ে পিচের রাস্তা সংস্কারের কাজ জোরকদমে শুরু হবে। ইতিমধ্যেই কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মূল সড়কে রাতের বেলায় পিচের কাজ শুরু করেছে পুরভবনের রোড ডিপার্টমেন্ট। তবে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন বরো এলাকায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি রাস্তা মেরামতির জন্য প্রয়োজনীয় পিচ ও স্টোনচিপস সরবরাহেও সমস্যা রয়েছে। ফলে শহরের সব ওয়ার্ডে এখনও সমানভাবে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
## বৃষ্টিতে বেহাল কলকাতার বহু রাস্তা
বর্ষার শুরু থেকেই কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক রাস্তা খারাপ হতে শুরু করে। লাগাতার বৃষ্টির জেরে শহরের বহু রাস্তায় জল জমে যায়। দীর্ঘক্ষণ জল দাঁড়িয়ে থাকায় রাস্তার পিচ নরম হয়ে উঠে যেতে থাকে। কোথাও ছোট গর্ত বড় আকার নেয়, আবার কোথাও রাস্তার একাধিক অংশ ভেঙে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
শুধু শহরের অলিগলি নয়, কলকাতার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও একই ছবি দেখা গিয়েছে। অফিসযাত্রী, স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, রোগী নিয়ে যাওয়া অ্যাম্বুল্যান্স এবং সাধারণ যানবাহনকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গর্ত এড়াতে গিয়ে অনেক সময় যানজট তৈরি হচ্ছে। আবার বৃষ্টির জলে গর্ত ঢাকা পড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে পুজোর আগে রাস্তা সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছে। কলকাতায় দুর্গাপুজোর সময় দেশ-বিদেশের বহু মানুষ আসেন। শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। তাই পুজোর আগে রাস্তা মেরামত করা পুরসভার কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
## বিশ্বকর্মা পুজোর পর জোরকদমে কাজ
পুরসভা জানিয়েছে, বিশ্বকর্মা পুজোর পর রাস্তা সংস্কারের কাজ আরও দ্রুত গতিতে শুরু করা হবে। মূলত বৃষ্টির কারণে এতদিন বিভিন্ন বরোতে পিচের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যে পিচ ঢালাই করলে কাজের গুণমান ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই কারণে আবহাওয়ার পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেই কাজের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পুরসভার রোড ডিপার্টমেন্ট ইতিমধ্যেই শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে রাতের বেলায় কাজ শুরু করেছে। দিনের ব্যস্ত সময়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে রাতে রাস্তা মেরামতির কাজ করা হচ্ছে। এতে যানজট কম হবে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতেও তুলনামূলক কম সমস্যা তৈরি হবে বলে মনে করছে পুরপ্রশাসন।
তবে শহরের সব বরোতে এখনও একইভাবে কাজ শুরু হয়নি। রাস্তা মেরামতির জন্য প্রয়োজনীয় পিচ ও স্টোনচিপসের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
## পিচ ও স্টোনচিপস সরবরাহে সমস্যা
রাস্তা মেরামতির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ আসে মূলত পামারবাজার এবং গোঁরাগাছার দুটি প্ল্যান্ট থেকে। সেখানে পিচ ও স্টোনচিপস মিশিয়ে রাস্তা সংস্কারের উপযোগী উপাদান তৈরি করা হয়। কিন্তু এই উপকরণ এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে না বলে পুরসভা সূত্রে খবর।
এই সরবরাহ ঘাটতির কারণে কলকাতার ১৬টি বরোতে এখনও সেভাবে পিচের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। একদিকে বৃষ্টির সমস্যা, অন্যদিকে মেরামতির উপকরণ সরবরাহে ঘাটতি—দুই কারণে কাজের গতি কমেছে।
পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের একাংশের বক্তব্য, পুজোর আগে সব রাস্তা মেরামত করতে হলে উপকরণ সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা জরুরি। তা না হলে একসঙ্গে বহু এলাকায় কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না। ফলে পুজোর সময়েও শহরের কিছু রাস্তা খারাপ অবস্থায় থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
## জল ও নিকাশির লাইনের কাজেও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা
রাস্তা খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে জল ও নিকাশির লাইনের কাজকেও দেখা হচ্ছে। ভোটের আগে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় পানীয় জল এবং নিকাশির একাধিক লাইন বসানোর কাজ হয়েছিল। সেই কাজের জন্য বহু জায়গায় রাস্তা কাটা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর সব রাস্তা যথাযথভাবে মেরামত করা হয়নি বলে অভিযোগ।
পরবর্তীতে বর্ষার জল ঢুকে সেই কাটা অংশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও রাস্তার মাটি বসে গিয়েছে, কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাস্তা কাটার পর দ্রুত মেরামত না করায় সমস্যা আরও বেড়েছে।
পুরসভার তরফে রাস্তা মেরামতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে গত কয়েক মাসে অনেক জায়গায় কাজ শুরু করা যায়নি। লিখিত নির্দেশের অপেক্ষায় বিভিন্ন রাস্তা সংস্কারের কাজ আটকে ছিল বলে খবর।
## ঠিকাদারদের বিক্ষোভেও কাজ ব্যাহত
রাস্তা মেরামতির কাজের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারদের বকেয়া পাওনা নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছে। বকেয়া টাকা না পাওয়ায় ঠিকাদারদের একাংশ টেন্ডার বয়কট করেছিলেন বলে পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে। এর ফলে রাস্তা সংস্কারের কাজ আরও ধীর হয়ে পড়ে।
অর্থ বরাদ্দ এবং টেন্ডার সংক্রান্ত সমস্যার কারণে বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাজ শুরু করা যায়নি। পুরপ্রশাসনের পক্ষ থেকে এই জটিলতা মেটানোর চেষ্টা করা হলেও সব ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধান হয়নি। ফলে নাগরিকদের দুর্ভোগ বাড়তে থাকে।
তবে এবার পুজোর কথা মাথায় রেখে পুরসভার মেরামতির তহবিল ব্যবহার করে বরোভিত্তিক রাস্তা সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বরো এক্সিকিউটিভদের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, মহালয়ার আগেই অধিকাংশ রাস্তার কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হবে।
## পুজোর আগে রাস্তা মেরামত কতটা সম্ভব?
মহালয়ার আগেই রাস্তা সংস্কারের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হলেও বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, কলকাতায় এখনও বর্ষার প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। আবার পুজোর আগে শহরের বহু জায়গায় মণ্ডপ তৈরি, আলো লাগানো এবং অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ শুরু হবে। ফলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বা মেরামতির কাজের সঙ্গে পুজোর প্রস্তুতির সমন্বয় করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের আরও একটি আশঙ্কা রয়েছে। রাস্তা মেরামতের পর ফের যদি জল, নিকাশি, বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট পরিষেবার জন্য রাস্তা কাটা হয়, তাহলে নতুন করে সমস্যা তৈরি হবে। কলকাতায় জল ও নিকাশির লাইনের পাশাপাশি সিইএসসি এবং জিও ফাইবারের কাজের জন্য বিভিন্ন সময়ে রাস্তা খোঁড়া হয়। ফলে একটি রাস্তা মেরামত করার পর সেটি আবার কাটা হলে পুরসভার কাজের সুফল নষ্ট হতে পারে।
এই কারণে রাস্তা কাটার বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পুরসভার আধিকারিকরা। একই রাস্তার নীচে বিভিন্ন পরিষেবার কাজ আগে শেষ করে তারপর পিচ ঢালাই করা গেলে ভবিষ্যতে রাস্তা বারবার কাটার প্রয়োজন কমবে।
## নাগরিকদের দুর্ভোগ কমানোই লক্ষ্য
কলকাতার রাস্তা সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হল সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো। পুজোর সময় শহরে যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়। তার সঙ্গে যদি রাস্তার গর্ত, ভাঙা পিচ এবং জল জমার সমস্যা থাকে, তাহলে যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়বে।
তাই বিশ্বকর্মা পুজোর পর থেকেই রাস্তা মেরামতির কাজ দ্রুত শেষ করার দিকে নজর দিচ্ছে পুরসভা। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, হাসপাতালের সামনে, স্কুল-কলেজ সংলগ্ন এলাকা এবং ব্যস্ত বাজারের রাস্তা আগে মেরামত করা হতে পারে। একইসঙ্গে ছোট রাস্তা ও গলিগুলির অবস্থার দিকেও নজর দেওয়ার দাবি উঠেছে।
সব মিলিয়ে, কলকাতা পুরসভার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হল পুজোর আগে শহরের রাস্তা চলাচলের উপযোগী করে তোলা। বৃষ্টি, উপকরণের ঘাটতি, ঠিকাদারদের বকেয়া এবং রাস্তা কাটার সমস্যা—সবকিছু সামলে কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। পুরসভার আশ্বাস অনুযায়ী মহালয়ার আগেই অধিকাংশ রাস্তা সংস্কার করা গেলে পুজোর মরশুমে শহরবাসী ও দর্শনার্থীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।


