নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর আয়োজিত হতে চলেছে ২০২৬ সালের BRICS শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনেতা ও প্রতিনিধি এই সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আসছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি বিদেশি অতিথিদের সামনে ভারতের বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতিকেও তুলে ধরতে প্রস্তুত আয়োজকরা। অতিথিদের পছন্দ, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন মাথায় রেখে তৈরি করা হচ্ছে বিশেষ মেনু। সেখানে যেমন থাকছে বাজরা, জোয়ার, রাগির মতো ‘শ্রী অন্ন’ দিয়ে তৈরি খাবার, তেমনই থাকছে বিভিন্ন রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী পদ, বিরিয়ানি, কবাব এবং ভারতীয় গ্রেভির নানা স্বাদ।
### ভারতীয় স্বাদের সঙ্গে বিদেশি অতিথিদের পছন্দ
২০২৬ সালের BRICS সম্মেলন ভারতের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক আয়োজন নয়, দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরারও একটি বড় সুযোগ। তাই অতিথিদের খাবারের তালিকাতেও সেই বৈচিত্র্য রাখার চেষ্টা হয়েছে। দিল্লির বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেল নিজেদের মতো করে বিদেশি রাষ্ট্রনেতা এবং প্রতিনিধিদের জন্য বিশেষ মেনু প্রস্তুত করছে। অতিথিদের দেশভিত্তিক পছন্দ, খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার বদলানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ শেফদের সঙ্গে বিদেশি প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও খাবারের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজে যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। কিছু হোটেলে অতিথিদের পছন্দের উপকরণ ও খাবারের ধরন সম্পর্কে আগেই তথ্য নেওয়া হয়েছে। ফলে একই টেবিলে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি নির্দিষ্ট দেশের পছন্দ অনুযায়ী তৈরি পদও দেখা যেতে পারে।
### বাজরা, জোয়ার, রাগিতে গুরুত্ব
এবারের মেনুর অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে ভারতের ঐতিহ্যবাহী মিলেট বা ‘শ্রী অন্ন’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক স্তরে মিলেটকে স্বাস্থ্যকর ও টেকসই খাদ্য হিসেবে তুলে ধরার যে প্রচেষ্টা চলছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই BRICS অতিথিদের মেনুতেও এই শস্যের ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রস্তুত তালিকায় রাগি দোসা, বাজরা উপমা এবং মিলেট পঙ্গল রাখার কথা জানা গিয়েছে। এর পাশাপাশি থাকবে মরসুমি ফল, নারকেলের জল এবং তাজা ছাছের মতো তুলনামূলক হালকা ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অতিথিদের জন্য ভারতীয় খাবারের পরিচিত স্বাদের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকেও যুক্ত করা হচ্ছে।
### এক মেনুতেই রাজস্থান থেকে দক্ষিণ ভারত
BRICS অতিথিদের জন্য তৈরি খাবারের তালিকায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের স্বাদকে জায়গা দেওয়া হচ্ছে। দুপুরের খাবারে গুজরাটি, রাজস্থানি এবং দক্ষিণ ভারতীয় থালির ব্যবস্থা রাখার কথা জানা গিয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রান্নার বৈচিত্র্য একই আয়োজনের মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা থাকছে।
শুধু নিরামিষ খাবার নয়, কাশ্মীরি পুলাও, দাক্ষিণাত্যর স্বাদের পদ, হায়দরাবাদি ভেজ এবং নন-ভেজ বিরিয়ানির মতো খাবারও মেনুতে থাকার কথা। দক্ষিণ ভারতীয় স্ট্যুও রাখা হচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
### অবধি কবাব থেকে হায়দরাবাদি বিরিয়ানি
ভারতীয় মশলা এবং ধীর আঁচে রান্না করা খাবারের স্বাদও বিদেশি অতিথিদের সামনে তুলে ধরা হবে। মেনুতে অবধি কবাব, তন্দুরি পদ এবং ধীর আঁচে তৈরি বিভিন্ন ভারতীয় গ্রেভি রাখার প্রস্তুতি চলছে।
হায়দরাবাদি বিরিয়ানিও এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে। ভারতীয় রান্নার বৈচিত্র্য বোঝাতে উত্তর ভারত, দক্ষিণ ভারত, রাজস্থান, গুজরাট এবং হায়দরাবাদের মতো বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারকে একই মেনুতে যুক্ত করা হচ্ছে।
### নিরামিষ-আমিষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা
বিদেশি রাষ্ট্রনেতা ও প্রতিনিধিদের খাদ্যাভ্যাস এক নয়। কেউ নিরামিষভোজী, কেউ আবার নির্দিষ্ট ধরনের মাংস খান না। কারও ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধিনিষেধ রয়েছে, আবার কেউ স্বাস্থ্যগত কারণে নির্দিষ্ট খাবার এড়িয়ে চলেন। এই বিষয়গুলিকে মাথায় রেখেই নিরামিষ এবং আমিষ খাবারের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধিদলের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী আলাদা রান্নাঘর বা নির্দিষ্ট শেফ দিয়ে খাবার প্রস্তুতের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে কোনও অতিথির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে যাতে সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
### তেল-মশলা ছাড়াও থাকবে খাবারের বিকল্প
সব অতিথি যে ভারী ভারতীয় খাবার পছন্দ করবেন, এমনটা নয়। তাই লাইভ কুকিং কাউন্টারে তেল ও মশলা ছাড়া customised continental breakfast দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
এর ফলে অতিথিরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী খাবার বেছে নিতে পারবেন। বিশেষ করে দীর্ঘ কূটনৈতিক বৈঠকের মধ্যে স্বাস্থ্যকর ও হালকা খাবারের প্রয়োজন মেটাতেও এই ধরনের বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
### রাজ্যের খানসামাদের হাতেও বিশেষ দায়িত্ব
BRICS অতিথিদের জন্য আয়োজিত সরকারি নৈশভোজেও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের রান্নার বৈচিত্র্য তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। ভারত মণ্ডপমে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের দেওয়া নৈশভোজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খানসামারা খাবার প্রস্তুত করবেন বলে রিপোর্টে জানা গিয়েছে।
এর ফলে বিদেশি অতিথিরা শুধু দিল্লি বা উত্তর ভারতের খাবার নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব রান্নার স্বাদ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। খাবারের মাধ্যমে ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরার এই উদ্যোগ সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
### খাবারের নিরাপত্তায় জিরো টলারেন্স
রাষ্ট্রনেতাদের খাবারের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। BRICS সম্মেলনকে কেন্দ্র করে খাদ্য নিরাপত্তাতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলে কাঁচামাল, মশলা এবং বেকারি সামগ্রীর নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
খাবার পরিবেশনের ঠিক আগে তার গুণমান এবং স্বাস্থ্যবিধি পরীক্ষা করার জন্য বিশেষ খাদ্য নিরাপত্তা আধিকারিক ও মাইক্রোবায়োলজিস্টদেরও দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানা গিয়েছে। অর্থাৎ খাবারের স্বাদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তার নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
### দিল্লির হোটেলগুলিতে বিশেষ প্রস্তুতি
BRICS সম্মেলন উপলক্ষে দিল্লির একাধিক বিলাসবহুল হোটেলে ইতিমধ্যেই বিশেষ প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তাজ মহল হোটেল, ITC Maurya, The Leela Palace, The Oberoi, Shangri-La, Taj Palace এবং The Lalit-এর মতো হোটেলগুলিতে বিদেশি প্রতিনিধিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কিছু হোটেলে রাষ্ট্রনেতাদের নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী খাবার তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অতিথিদের পছন্দের উপকরণও তাঁদের প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে হোটেলে পৌঁছেছে বলে রিপোর্টে জানা গিয়েছে।
### ভারতের আতিথেয়তায় ‘দেশি’ ছোঁয়া
খাবারের পাশাপাশি অতিথিদের স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রেও ভারতীয় সংস্কৃতিকে সামনে রাখা হয়েছে। দিল্লির বিভিন্ন হোটেলে ভারতীয় সাজসজ্জা, ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে। কোথাও চালের দানা দিয়ে তৈরি ব্যক্তিগতকৃত স্মারক, কোথাও ভারতীয় রান্নার বিশেষ উপহারও রাখা হচ্ছে অতিথিদের জন্য।
২০২৬ সালের BRICS সম্মেলন ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হবে। ১১ সদস্য দেশ এবং ১০টি অংশীদার দেশের প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনের বিভিন্ন পর্বে অংশ নেবেন। খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসবে।
সব মিলিয়ে, BRICS সম্মেলনে কূটনীতির পাশাপাশি ভারতের রান্নাঘরও যেন নিজের ভাষায় কথা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাজরা-রাগি থেকে বিরিয়ানি, অবধি কবাব থেকে দক্ষিণ ভারতীয় স্ট্যু—বিভিন্ন স্বাদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অতিথিদের সামনে ভারতের খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরাই এবার মূল লক্ষ্য। খাবারের নিরাপত্তা, অতিথিদের ব্যক্তিগত পছন্দ এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প—সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে এই আয়োজনকে আন্তর্জাতিক মানের করে তোলার প্রস্তুতি চলছে।


