দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির কাছে প্যান্ডেল, প্রতিমা, ঢাকের বাদ্যি আর উৎসবের আবহ। সেই উৎসবের আমেজকে আরও জমজমাট করে তুলতে এবার বড়সড় সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে রাজ্যে। মহালয়ার দিন থেকেই কলকাতায় শুরু হতে চলেছে বিশেষ অনুষ্ঠান। আর সেই আয়োজনের অন্যতম বড় আকর্ষণ হতে চলেছে ইডেন গার্ডেন্সের মেগা শো। সেখানে এক মঞ্চে দেখা যেতে পারে দেশের একাধিক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীকে। শ্রেয়া ঘোষাল, শান এবং কুমার শানুর মতো তারকাদের উপস্থিতিতে মহালয়ার সন্ধ্যা হয়ে উঠতে পারে সুরের মহোৎসব।
শুধু কলকাতাতেই নয়, দুর্গাপুজো উপলক্ষে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। ‘ট্রিবিউট টু মা’ নামে বিশেষ সাংস্কৃতিক সফরের মাধ্যমে দুর্গাপুজোর আবহের সঙ্গে সংগীত, লোকসংস্কৃতি এবং বিনোদনকে একসূত্রে বাঁধার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে নবান্ন সূত্রের খবর।
### মহালয়ার ইডেনে তারার মেলা
এবারের দুর্গাপুজোর সরকারি আয়োজনের সূচনাপর্বেই বিশেষ নজর কাড়তে পারে ইডেন গার্ডেন্সের মেগা শো। মহালয়ার দিন কলকাতায় রেড রোডে রোড শো এবং ইডেন গার্ডেন্সে বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘ট্রিবিউট টু মা’ সাংস্কৃতিক সফরকেও।
প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছেন শ্রেয়া ঘোষাল, শান এবং কুমার শানুর মতো জনপ্রিয় শিল্পীরা। তাঁদের সঙ্গে আরও একাধিক পরিচিত কণ্ঠশিল্পী ও বিনোদন জগতের তারকারা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন। ফলে পুজোর আগেই কলকাতার সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে এই অনুষ্ঠান বড় জায়গা করে নিতে পারে।
বিশেষ করে শ্রেয়া ঘোষালের উপস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় গায়ক কুমার শানু এবং শানের গানও অনুষ্ঠানে নস্ট্যালজিয়ার আবহ তৈরি করতে পারে।
### ‘ট্রিবিউট টু মা’ কী?
‘ট্রিবিউট টু মা’ মূলত দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে একটি ভ্রমণভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা। এর মাধ্যমে মা দুর্গার বন্দনা, বাংলার লোকসংস্কৃতি, বাংলা ও ভারতীয় সংগীত এবং উৎসবের আবহকে একসঙ্গে তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজ্যের পাঁচটি জায়গায় দু’দিন করে অনুষ্ঠান হতে পারে। অর্থাৎ মোট ১০ দিনের একটি সাংস্কৃতিক সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর, নন্দীগ্রাম, শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর এবং বহরমপুর—এই পাঁচটি জায়গাকে সম্ভাব্য অনুষ্ঠানস্থল হিসেবে রাখা হয়েছে। তবে কোন দিনে কোন শিল্পী কোথায় পারফর্ম করবেন, সেই সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই কারণে শিল্পীদের নাম প্রকাশ্যে এলেও তাঁদের নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানস্থল বা দিনের তালিকাকে এখনই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
### পঞ্চমীতে দিঘায় বড় আয়োজন
রাজ্যের সাংস্কৃতিক সফরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটি হতে পারে দিঘায়। পঞ্চমীর দিন সেখানে মেগা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই অনুষ্ঠানে মোনালি ঠাকুর, মধুশ্রী, অন্তরা মিত্র, উজ্জ্বয়নী, জুনের মতো শিল্পীদের থাকার কথা রয়েছে। আরও বেশ কয়েকজন পরিচিত শিল্পী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন বলেও জানানো হয়েছে।
দিঘায় দুর্গাপুজোর পর্যটনকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই বিপুল মানুষের সমাগম হয়। তার সঙ্গে যদি এমন তারকা-সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যুক্ত হয়, তাহলে পুজোর মরশুমে সমুদ্রশহরের আকর্ষণ আরও বাড়তে পারে।
### বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক মঞ্চ
এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য শুধুমাত্র জনপ্রিয় শিল্পীদের দিয়ে গান গাওয়ানো নয়। দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বাংলার লোকশিল্প এবং আধুনিক সংগীতকে একই মঞ্চে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
দুর্গাপুজো এখন শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কলকাতা এবং বাংলার বিভিন্ন জায়গায় পুজোকে কেন্দ্র করে শিল্প, সংস্কৃতি, পর্যটন এবং বিনোদনের বিশাল পরিসর তৈরি হয়েছে। সেই বৃহত্তর উৎসবের পরিসরকেই কাজে লাগিয়ে রাজ্যজুড়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
‘ট্রিবিউট টু মা’ নামটিও সেই ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একদিকে থাকবে দেবী দুর্গার বন্দনা, অন্যদিকে থাকবে বাংলার সংগীত ও সংস্কৃতির নানা রূপ। ফলে অনুষ্ঠানগুলি পুজোর আনন্দের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও তুলে ধরতে পারে।
### বিজয়ার গঙ্গাবক্ষে আরও চমক
পুজোর শুরুতেই নয়, বিজয়া দশমীর সন্ধ্যাতেও বড়সড় আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। কলকাতার গঙ্গার রিভারফ্রন্ট এলাকায় আলো, আতসবাজি, ড্রোন শো এবং ভাসমান ট্যাবলো প্রদর্শনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যাসাগর সেতু, হাওড়া ব্রিজ এবং গঙ্গার দুই পাড় আলোয় সাজিয়ে তোলার কথা। বিদ্যাসাগর সেতু থেকে বাবুঘাটের মধ্যবর্তী রিভারফ্রন্ট এলাকায় বিশেষ অনুষ্ঠান হতে পারে। আকাশে ‘আবার আসবে উমা’ নামে ড্রোন শো এবং গঙ্গার উপর ভাসমান ট্যাবলো এই আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ হতে পারে।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক মানের আতসবাজির প্রদর্শনের পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাবুঘাট, গোয়ালিয়র ঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট এবং নদীপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় দর্শকদের ভিড় হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
### পুজোর আগে থেকেই উৎসবের আবহ
সাধারণত মহালয়ার সঙ্গে বাঙালির পুজোর আবেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সেই দিন থেকেই যদি কলকাতার ইডেনে এমন তারকাখচিত অনুষ্ঠান শুরু হয়, তাহলে পুজোর উৎসবের আবহ আরও আগে থেকেই তৈরি হয়ে যাবে।
একদিকে ইডেন গার্ডেন্সে জনপ্রিয় গায়কদের নিয়ে মেগা শো, অন্যদিকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ‘ট্রিবিউট টু মা’-এর অনুষ্ঠান এবং বিজয়ার দিনে গঙ্গাবক্ষে আলো-ড্রোন-আতসবাজির আয়োজন—সব মিলিয়ে ২০২৬-এর দুর্গাপুজোয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিসর যে বড় হতে চলেছে, তার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই মিলেছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সমস্ত আয়োজনের বেশ কিছু অংশ এখনও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। শিল্পীদের নির্দিষ্ট পারফরম্যান্সের দিন, অনুষ্ঠানস্থলের পূর্ণাঙ্গ সূচি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পরেই পুরো ছবিটি স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর দুর্গাপুজোয় শুধু প্যান্ডেল পরিক্রমা নয়, তারকা-সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উৎসবের অন্যতম বড় আকর্ষণ হতে চলেছে। মহালয়ার ইডেন থেকে পঞ্চমীর দিঘা, আর বিজয়ার গঙ্গাবক্ষ—উৎসবের বিভিন্ন পর্বকে সুর, আলো এবং বিনোদনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। এখন অপেক্ষা চূড়ান্ত সূচি প্রকাশের। তখনই জানা যাবে কোন মঞ্চে ঠিক কোন তারকা কবে গান শোনাবেন।


