দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় পাঁচতলা একটি ছাত্রাবাস ভেঙে পড়ার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, ওই ভবনটি ছেলেদের PG হিসেবে ব্যবহার করা হত এবং সেখানে মাত্র ১৫টি ঘরে প্রায় ৪৫ জন ছাত্র থাকতেন। ভবনটির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ৮১ বছরের অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় বায়ুসেনার সার্জেন্ট হরিরাম গুপ্ত। পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, প্রতি ছাত্রের কাছ থেকে মাসে অন্তত ১০ হাজার টাকা নেওয়া হত। সেই হিসাবে PG থেকে মাসিক আয় ৪ লক্ষ টাকারও বেশি হতে পারে বলে তদন্তকারীদের অনুমান।
৬ সেপ্টেম্বর সত্য নিকেতনে ওই ভবনটি ভেঙে পড়ে। ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে, যাঁদের মধ্যে পাঁচজন ছাত্র এবং দু’জন শ্রমিক ছিলেন। আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর থেকেই ভবনটির নির্মাণ, সংস্কার এবং PG পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
### ১৫ ঘরে ৪৫ ছাত্র, প্রত্যেকের ভাড়া ১০ হাজার
তদন্তকারীদের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৫ বর্গগজের জমির উপর তৈরি ভবনটির ভিতরে ১৫টি ঘর করা হয়েছিল। প্রতিটি ঘরে প্রায় তিনজন করে ছাত্র থাকতেন। অর্থাৎ একটি ছোট জায়গায় মোট ৪৫ জন ছাত্রকে রাখা হয়েছিল। প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসে অন্তত ১০ হাজার টাকা নেওয়া হত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই হিসাব অনুযায়ী ৪৫ জন ছাত্রের কাছ থেকে মাসিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। সেই কারণেই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে PG-টিকে অবসরপ্রাপ্ত বায়ুসেনা সার্জেন্টের জন্য উল্লেখযোগ্য আয়ের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই আয় সংক্রান্ত তথ্য পুলিশের সূত্রনির্ভর এবং তদন্তের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
### সম্পত্তির মালিক স্ত্রী, পরিচালনায় স্বামী-ছেলে
পুলিশের তদন্তে সম্পত্তির মালিকানা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। নথি অনুযায়ী, সত্য নিকেতনের সম্পত্তিটি হরিরামের স্ত্রী উর্মিলা গুপ্তার নামে ছিল। উর্মিলার বয়স ৭৫ বছর। অন্যদিকে ভবনটি পরিচালনা এবং PG ব্যবস্থাপনার সঙ্গে হরিরাম ও তাঁদের ছেলে মহেশ গুপ্ত যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মহেশের বয়স ৫২ বছর। তিনি গুরগাঁওয়ে একটি হার্ডওয়্যার ও পেইন্টের দোকানও চালান। তদন্তকারীদের মতে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই PG পরিচালনার দায়িত্ব ভাগ করা ছিল। ভবন ধসের পর হরিরাম, উর্মিলা এবং মহেশ—তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।
### কেন ভেঙে পড়ল ভবন? তদন্তে একাধিক প্রশ্ন
ভবন ধসের সঠিক কারণ এখনও তদন্তাধীন। তবে পুলিশ জানতে পেরেছে, দুর্ঘটনার সময় ভবনের বেসমেন্টে নির্মাণ বা সংস্কারের কাজ চলছিল। জলের জমা এবং সিপেজের সমস্যা দূর করার জন্য ওই কাজ করা হচ্ছিল বলে অভিযুক্তদের তরফে পুলিশকে জানানো হয়েছে।
পুলিশের দাবি, আহত এক শ্রমিকও বেসমেন্টে নির্মাণকাজ চলার বিষয়টি জানিয়েছেন। হরিরাম নিজেও ওই সংস্কারকাজের তদারকি করছিলেন বলে তদন্তকারীদের বক্তব্য। এই কাজ ভবনের কাঠামো দুর্বল করে দিয়েছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
### অনুমোদন ছিল একতলা, তৈরি হয়েছিল আরও কয়েক তলা?
তদন্তে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বিদ্যুৎ সংক্রান্ত নথিতে ভবনটির জন্য মাত্র দু’টি তলার সংযোগের তথ্য ছিল। অথচ বাস্তবে ভবনটি ছিল গ্রাউন্ড প্লাস পাঁচতলা। অর্থাৎ অনুমোদিত কাঠামোর তুলনায় অতিরিক্ত তলা তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
FIR-এও অভিযোগ করা হয়েছে, পুরনো ভবনের ভিত্তি অতিরিক্ত ভার বহনের উপযুক্ত না হওয়া সত্ত্বেও আরও তলা যোগ করা হয়েছিল। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াতেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
### গ্রেফতার হরিরাম, স্ত্রী ও ছেলে
ভবন ধসের পর হরিরাম গুপ্তকে খুঁজতে তল্লাশি শুরু করে দিল্লি পুলিশ। শেষ পর্যন্ত রাজস্থানের ভিওয়াড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁর স্ত্রী উর্মিলা এবং ছেলে মহেশকেও গ্রেফতার করা হয়।
আদালত হরিরাম ও উর্মিলাকে ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়েছে। মহেশকে দু’দিনের পুলিশি হেফাজতে দেওয়া হয়েছে। PG পরিচালনাকারী অন্যান্য ব্যক্তি এবং নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ঠিকাদারের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
### সাত মৃত্যু, পাঁচজন আহত
সত্য নিকেতনের এই দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজ প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে চলে। ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয় এবং পাঁচজন আহত হন। মৃতদের মধ্যে পাঁচজন ছাত্র এবং দু’জন শ্রমিক ছিলেন।
ঘটনার পর দিল্লিতে PG ও ছাত্রাবাসগুলির নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাসের আশপাশে বিপুল সংখ্যক ছাত্র PG-তে থাকেন। ফলে পুরনো বাড়িকে অতিরিক্ত তলা যোগ করে PG-তে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে কাঠামোগত নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
### PG নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
সত্য নিকেতনের এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি ভবন ধসের তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দিল্লির অন্যান্য ছাত্রাবাস ও PG-র নিরাপত্তা নিয়েও প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ছে। ইতিমধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন ছাত্রকেন্দ্রে PG ও হস্টেলের কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, অনুমোদন ছাড়া ভবন সম্প্রসারণ, বেসমেন্টে কাজ এবং অতিরিক্ত সংখ্যক ছাত্র রাখার মতো বিষয়গুলি এই দুর্ঘটনার পর বিশেষ নজরে এসেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভবন ধসের জন্য কোনও একটি কারণকে চূড়ান্ত বলে ধরা হচ্ছে না। তবে সত্য নিকেতনের ঘটনা দিল্লির ছাত্রাবাসগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড়সড় দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে।


