দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় বহুতল ভবন ভেঙে পড়ার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬। রবিবার দুপুরে আচমকাই ভেঙে পড়ে ওই পাঁচতলা ভবনটি। ভবনটি মূলত ছাত্রদের পেইং গেস্ট বা PG আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হত। দুর্ঘটনার পর থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয়েছে উদ্ধারকাজ। সোমবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ১১ জনকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। আরও কয়েকজন ভিতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছাকাছি। রবিবার দুপুর প্রায় সাড়ে ১টা নাগাদ আচমকা গোটা বাড়িটি ধসে পড়ে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বহুতল ভবনটি পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে উদ্ধারকাজে হাত লাগান। পরে দিল্লি ফায়ার সার্ভিস, দিল্লি পুলিশ এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা NDRF ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
### ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়েছিলেন বহু পড়ুয়া
ভবনটিতে মূলত পড়ুয়া এবং তরুণদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া কয়েকজন ফোন করে বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের অবস্থানও জানান। উদ্ধারকারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে স্তরে স্তরে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আটকে থাকা ব্যক্তিদের খোঁজ করেন।
উদ্ধারকাজে বিশেষ লাইফ ডিটেক্টর, ডগ স্কোয়াড এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সরু গলি এবং পাশের একটি অস্থির ভবনের কারণে উদ্ধার অভিযান বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। NDRF-এর একাধিক দল ঘটনাস্থলে রয়েছে। জীবিত কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে।
AIIMS-এর ট্রমা সেন্টারেও একাধিক আহতকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, কয়েকজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল এবং চিকিৎসাধীন একজনেরও পরে মৃত্যু হয়। আরও কয়েকজন আহতের চিকিৎসা চলছে।
### বেসমেন্টে চলছিল নির্মাণকাজ, উঠছে প্রশ্ন
প্রাথমিক তদন্তে ভবনটির বেসমেন্টে নির্মাণ বা মেরামতির কাজ চলার বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েকদিন ধরেই সেখানে কাজ চলছিল। বর্ষার সময়ে বেসমেন্টে জল জমে থাকায় ভবনের কাঠামো দুর্বল হয়ে থাকতে পারে বলেও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। তবে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনও চূড়ান্তভাবে জানা যায়নি।
কিছু প্রতিবেদনে ভবনটির বয়স প্রায় ৪০–৫০ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্মাণের অনুমোদন, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং পরবর্তীকালে কোনও অনুমোদনহীন পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না—সবই তদন্তের আওতায় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে বেসমেন্টে জল জমা এবং সেখানে চলা মেরামতির কাজ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
### মালিকের বিরুদ্ধে FIR, হবে ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত
ঘটনার পর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। প্রাথমিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর তিনি গোটা ঘটনার ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবনের মালিকের বিরুদ্ধে FIR করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পুলিশের তরফে মালিকের বিরুদ্ধে গাফিলতি এবং মৃত্যুর জন্য দায়বদ্ধতার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্তে কারও গাফিলতি বা নিয়মভঙ্গের প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবনটির নির্মাণ, মেরামতি এবং সেখানে PG চালানোর অনুমোদন ছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
### বেআইনি নির্মাণ নিয়ে MCD-র কড়া পদক্ষেপ
সত্য নিকেতনের দুর্ঘটনার পর দিল্লি পুরনিগম বা MCD-র নজর পড়েছে শহরের অন্যান্য বহুতল ও বেআইনি নির্মাণের দিকেও। চার তলার বেশি বেআইনি নির্মাণগুলির বিরুদ্ধে দ্রুত সিল করার প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর ফের প্রশ্ন উঠেছে, দিল্লির ছাত্র অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে কীভাবে নিয়ম না মেনে PG বা আবাসন চলছে এবং নির্মাণ সংক্রান্ত নিয়মকানুন কতটা কার্যকরভাবে নজরদারি করা হচ্ছে। সত্য নিকেতনের এই দুর্ঘটনা সেই প্রশ্নকেই আরও সামনে এনে দিয়েছে।
### উদ্ধারকাজ এখনও জারি
মৃতের সংখ্যা ছয়ে পৌঁছলেও উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে NDRF, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে। উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্র ব্যবহারের সময়ও অত্যন্ত সতর্ক থাকছেন, কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কেউ থাকলে অতিরিক্ত চাপ বা কম্পনে বিপদ বাড়তে পারে।
দিল্লির এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-সহ একাধিক নেতা। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ধ্বংসস্তূপে আর কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করা এবং উদ্ধার অভিযান দ্রুত শেষ করা।


