সব বাধা পেরিয়ে দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির তৈরি করল পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের খুদে পড়ুয়ারা। স্কুল চত্বর জলে ডুবে থাকায় হেঁটে সেখানে পৌঁছনোর কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু তাতেও থেমে থাকেনি স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি। শেষ পর্যন্ত নৌকায় চেপেই স্কুলে পৌঁছে জাতীয় পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অংশ নিল ছোট ছোট পড়ুয়ারা। হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে ‘বন্দে মাতরম’, আর কণ্ঠে দেশাত্মবোধক স্লোগান—প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের এই উদযাপন মন ছুঁয়ে গিয়েছে স্থানীয়দের।
শনিবার, ১৫ আগস্ট দেশজুড়ে পালিত হয়েছে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস। দেশের অন্যান্য প্রান্তের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেই মতো সবংয়ের চাঁদাগোবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়েও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্ষার জেরে স্কুল চত্বর জলমগ্ন হয়ে পড়ায় তৈরি হয় বড় সমস্যা।
স্কুলের চারপাশে এবং চত্বরে জমে থাকা জল এতটাই বেড়ে যায় যে সাধারণভাবে হেঁটে স্কুলে যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও জল হাঁটুর উপর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এমন পরিস্থিতিতে খুদে পড়ুয়াদের নিরাপত্তার কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছিল। ফলে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান কীভাবে হবে, পড়ুয়ারা কীভাবে সেখানে পৌঁছবে—তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তায় পড়েন শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
কিন্তু অনুষ্ঠান বাতিল করার বদলে অন্য পথ খোঁজা হয়। পড়ুয়াদের দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের আগ্রহ দেখে এগিয়ে আসেন এলাকার বাসিন্দা ও অভিভাবকরা। তাঁদের উদ্যোগেই একটি নৌকার ব্যবস্থা করা হয়। সেই নৌকায় চেপেই একে একে স্কুলের সামনে পৌঁছতে শুরু করে খুদে পড়ুয়ারা।
নৌকার মধ্যে জায়গা খুব বেশি ছিল না। তবুও ছোট ছোট পড়ুয়ারা গাদাগাদি করে সেখানে দাঁড়িয়ে বা বসে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ আবার দেশাত্মবোধক স্লোগান দিতে থাকে। জলমগ্ন স্কুলের সামনে নৌকায় দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা দিবস পালন করার সেই দৃশ্য স্থানীয়দের কাছে কার্যত অভাবনীয় হয়ে ওঠে।
জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময়ও পড়ুয়ারা নৌকাতেই ছিল। জল পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছনোর এই অভিনব ব্যবস্থা শুধু অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করার সুযোগই করে দেয়নি, বরং স্বাধীনতা দিবসের আবেগকেও আরও বিশেষ করে তুলেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান জানাতে এবং দেশের স্বাধীনতা উদযাপন করতে যে আগ্রহ তারা দেখিয়েছে, তা উপস্থিত অনেকেরই নজর কেড়েছে।
অনুষ্ঠান চলাকালীন খুদেদের মুখে শোনা যায় ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগান। শুধু তাই নয়, তাঁদের কণ্ঠে উঠে আসে মহাত্মা গান্ধী এবং ভগৎ সিংয়ের নামও। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত মহান ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করে স্লোগান দিতে দিতে নৌকায় বসেই অনুষ্ঠান উপভোগ করে পড়ুয়ারা।
স্কুল চত্বর জলমগ্ন থাকায় সরাসরি অনুষ্ঠানের জায়গায় পৌঁছতে না পারলেও, স্কুলের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখেন বেশ কিছু অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের চোখের সামনে জল পেরিয়ে নৌকায় করে খুদেদের স্কুলে পৌঁছনোর দৃশ্য তৈরি করে অন্যরকম আবহ। স্বাধীনতা দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে এমন অভিনব উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বর্ষাকালে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় জল জমা একটি পরিচিত সমস্যা। অতিবৃষ্টির কারণে গ্রামাঞ্চলের রাস্তা, স্কুল চত্বর এবং বসতবাড়ির আশপাশে জল জমে যায়। অনেক সময় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়। চাঁদাগোবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও সেই সমস্যাই দেখা দিয়েছে। তবে জল জমার কারণে অনুষ্ঠান বন্ধ না করে স্থানীয়দের সহযোগিতায় সেটি সম্পন্ন করার ঘটনা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
এই ঘটনার মধ্যে শুধু একটি স্কুলের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের ছবি নেই, রয়েছে পড়ুয়াদের মানসিকতার একটি দিকও। ছোট বয়সেই জাতীয় দিবসের গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের আগ্রহ এবং উৎসাহ স্পষ্ট হয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে পতাকা হাতে স্কুলে যাওয়া যেখানে স্বাভাবিক ঘটনা, সেখানে নৌকায় চেপে জল পেরিয়ে অনুষ্ঠানে পৌঁছনো তাদের কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে রইল।
অভিভাবকদের ভূমিকাও এই ঘটনায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খুদে পড়ুয়াদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তাঁরাই নৌকার ব্যবস্থা করেন। ফলে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত উদ্যোগে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয়।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই ধরনের সহযোগিতার ঘটনা স্থানীয় স্তরে সামাজিক সংহতির ছবিও তুলে ধরে। একটি স্কুলের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এলাকার মানুষ একসঙ্গে এগিয়ে এসে সমস্যার সমাধান করেছেন। ফলে জলমগ্ন স্কুলের চত্বরও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা দিবসের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়নি।
সবংয়ের চাঁদাগোবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই ঘটনা তাই স্বাধীনতা দিবসের দিনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একদিকে বর্ষার জল এবং যোগাযোগের সমস্যা, অন্যদিকে জাতীয় দিবস পালনের প্রবল আগ্রহ—এই দুইয়ের মধ্যে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে উদযাপনের ইচ্ছার। নৌকায় চেপে স্কুলে পৌঁছে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়ানো খুদেদের ছবি সেই বার্তাই দিয়েছে।
এদিনের অনুষ্ঠানে পড়ুয়াদের মুখে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করার দৃশ্য স্থানীয়দের মনে দাগ কেটেছে। স্বাধীনতা দিবস যে শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত আবেগের দিন—খুদেদের এই উদ্যোগ যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দিল।
প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবসে স্কুলগুলিতে পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু সবংয়ের এই স্কুলে এবারের উদযাপন হয়ে থাকল একেবারেই আলাদা। জলমগ্ন স্কুলে পৌঁছতে নৌকার ব্যবহার এবং সেই নৌকাতেই জাতীয় পতাকা হাতে পড়ুয়াদের অংশগ্রহণ এই অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, জল যতই বাধা হয়ে দাঁড়াক, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান থেকে পিছিয়ে যায়নি সবংয়ের চাঁদাগোবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুদে পড়ুয়ারা। অভিভাবক ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় নৌকায় চেপে স্কুলে পৌঁছে তারা জাতীয় পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। মুখে ছিল ‘বন্দে মাতরম’, কণ্ঠে দেশাত্মবোধক স্লোগান, আর মনে ছিল দেশের প্রতি ভালোবাসা। জলবন্দি স্কুলের এই অভিনব স্বাধীনতা দিবস উদযাপন তাই নিঃসন্দেহে এদিনের অন্যতম নজরকাড়া ছবি হয়ে রইল।


