পুজোর মরশুম শুরুর আগেই দার্জিলিংয়ের পর্যটন ব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হল নতুন বিতর্ক। পাহাড়ে পর্যটকদের নিয়ে ঘোরাফেরার ক্ষেত্রে সমতলের গাড়িগুলির উপর নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে পাহাড় ও সমতলের গাড়ির মালিক এবং চালকদের একাংশ। দার্জিলিংয়ের সংযুক্ত চালক মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সমতলের কোনও গাড়িকে পাহাড়ের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটক ঘোরাতে দেওয়া হবে না। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরেই শুরু হয়েছে চাপানউতোর।
সংগঠনের বক্তব্য, সমতলের গাড়িগুলি পর্যটকদের পাহাড়ে নিয়ে এসে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেওয়ার ফলে পাহাড়ের স্থানীয় গাড়িচালকরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই সমতলের গাড়িগুলি শুধুমাত্র পর্যটকদের পাহাড়ে পৌঁছে দিয়ে ফিরে যাবে—এমনই অবস্থান নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ে থাকা বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, বিশেষ করে জনপ্রিয় টাইগার হিলে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব স্থানীয় গাড়ির উপরেই থাকা উচিত বলে দাবি করা হয়েছে।
দার্জিলিংয়ের সংযুক্ত চালক মঞ্চের সম্পাদক প্রসন্ন প্রধানের বক্তব্য, সমতলের গাড়িচালকরা যদি পাহাড়ে এসে পর্যটকদের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানোর কাজ করেন, তাহলে স্থানীয় গাড়িচালকদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর দাবি, সমতলের গাড়িগুলি পর্যটকদের পাহাড়ে নিয়ে আসা এবং তাঁদের ফেরত নিয়ে যাওয়ার কাজ করুক। কিন্তু পাহাড়ের অভ্যন্তরে পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে যাতায়াতের জন্য স্থানীয় গাড়িগুলিকেই পরিষেবার সুযোগ দেওয়া উচিত। সেই কারণেই ১ সেপ্টেম্বর থেকে সমতলের গাড়িকে পাহাড়ে পর্যটক ঘোরাতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ সমতলের গাড়ির মালিক এবং চালকদের একাংশ। তাঁদের পালটা বক্তব্য, দার্জিলিং জেলার সর্বত্র গাড়ি চালানোর অনুমতি তাঁদের রয়েছে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট সংগঠন নিজেদের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁদের গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে পারে না। বাগডোগরা ট্যাক্সি ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে বিকাশ সাহা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তাঁরা এই সিদ্ধান্ত মানছেন না। তাঁর দাবি, তাঁদের কাছে গোটা দার্জিলিং জেলার জন্য বৈধ অনুমতি রয়েছে। প্রশাসনের তরফে কোনও নিষেধাজ্ঞা না থাকলে কোনও সংগঠন নিজেদের মতো করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলেও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
উত্তরবঙ্গের পর্যটন অর্থনীতিতে পাহাড় এবং সমতলের পরিবহণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। বাগডোগরা, শিলিগুড়ি এবং সংলগ্ন সমতল এলাকা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক দার্জিলিং, ঘুম, টাইগার হিল-সহ পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় যান। তাঁদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে সমতলের গাড়ির পাশাপাশি পাহাড়ের গাড়িও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যটকদের একাংশ সমতলের গাড়ি নিয়েই পাহাড়ে পৌঁছন এবং পরে সেই গাড়িতেই বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘোরেন। ফলে দুই এলাকার পরিবহণ ব্যবসার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পর্যটকদের পরিবহণ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। সমতলের গাড়িতে পর্যটকরা পাহাড়ে পৌঁছনোর পর তাঁদের নির্দিষ্ট জায়গায় নামিয়ে দিয়ে গাড়িগুলিকে ফিরে যেতে হবে। এরপর পাহাড়ের স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে পর্যটনকেন্দ্রগুলি ঘুরতে হতে পারে। এতে পর্যটকদের অতিরিক্ত পরিবহণ খরচ বাড়বে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একইসঙ্গে পর্যটন মরশুমে গাড়ির সহজলভ্যতা নিয়েও সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, সমতলের গাড়িচালকদের দাবি, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের নিয়ে দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করছেন। বৈধ অনুমতি থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র স্থানীয় সংগঠনের সিদ্ধান্তের কারণে তাঁদের পাহাড়ে পর্যটক ঘোরানো থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। ফলে আগামী দিনে বিষয়টি প্রশাসনিক স্তরে আরও বড় আকার নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
গোটা বিতর্কের মধ্যে প্রশাসনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এই বিষয়ে পরিবহণমন্ত্রী যা বলার বলবেন। তিনি নিজে এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত পরিবহণ দপ্তর কিংবা প্রশাসনের তরফে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।
ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে পরিবহণমন্ত্রী এবং প্রশাসনের একাধিক আধিকারিককে চিঠি দিয়েছে হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মহলের আশঙ্কা, পুজোর আগে এই ধরনের বিরোধ মিটিয়ে ফেলা না গেলে তার প্রভাব পর্যটন পরিষেবায় পড়তে পারে।
কারণ, দুর্গাপুজোর সময় উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে পর্যটকদের ভিড় সাধারণত বাড়তে শুরু করে। দার্জিলিং, কালিম্পং এবং আশপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলিতে হোটেল, গাড়ি, পর্যটন পরিষেবা এবং স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ এই মরশুমের উপর নির্ভরশীল। তাই গাড়ি চালকদের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু পরিবহণ ক্ষেত্র নয়, সামগ্রিক পর্যটন ব্যবসাতেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন, পাহাড় ও সমতলের গাড়ির মধ্যে এই দ্বন্দ্ব কীভাবে মেটানো হবে। সমতলের গাড়িচালকদের বৈধ অনুমতির বিষয়টি প্রশাসন কীভাবে দেখছে এবং পাহাড়ের স্থানীয় গাড়িচালকদের দাবির ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুজোর মরশুম সামনে থাকায় দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হলে পর্যটকদেরও সমস্যায় পড়তে হতে পারে।


