বাংলা নাট্যজগতের আকাশে ফের শোকের ছায়া। প্রয়াত বর্ষীয়ান অভিনেতা ও নাট্যকার পঙ্কজ মুন্সী। রবিবার শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত শারীরিক সমস্যায় বেশ কিছুদিন ধরে ভুগছিলেন এই প্রবীণ শিল্পী। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত চিকিৎসায় সাড়া দিলেন না তিনি। তাঁর প্রয়াণে বাংলা থিয়েটার, অভিনয় এবং সাংস্কৃতিক মহলে নেমে এসেছে গভীর শোক।
শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, নাট্যকার এবং নাট্য আন্দোলনের সঙ্গেও পঙ্কজ মুন্সীর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। বাংলা থিয়েটার থেকে বিকল্প ধারার নাট্যচর্চা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। তাঁর চলে যাওয়া তাই শুধুমাত্র একজন অভিনেতার প্রয়াণ নয়, বরং বাংলা মঞ্চের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হিসেবেই দেখছেন তাঁর সহকর্মী ও অনুরাগীরা।
## বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার পর হাসপাতালে ভর্তি
জানা গিয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন পঙ্কজ মুন্সী। বয়সের ভারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়লেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে ভাটা পড়েনি। অসুস্থতার কারণে শারীরিক সক্ষমতা কমেছিল, শ্রবণশক্তিও কিছুটা দুর্বল হয়েছিল। তবুও অভিনয়ের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা এবং নতুন কাজের প্রতি আগ্রহ শেষপর্যন্ত অটুট ছিল বলে জানিয়েছেন সহকর্মীরা।
রবিবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শেষ হয় তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পথচলা। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই টলিপাড়া থেকে নাট্যমঞ্চ—বিভিন্ন মহলে শোকবার্তা আসতে শুরু করে।
## অভিনয়ের পাশাপাশি নাট্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পঙ্কজ মুন্সীর পরিচয় কেবল পর্দার অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর গভীর যোগাযোগ ছিল। বিকল্প ধারার নাট্য আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। নাটক পরিচালনা ও অভিনয়ের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রের প্রতি গভীর মনোযোগ। কোনও একটি চরিত্রে অভিনয় করার আগে শুধু নিজের অংশ নয়, সম্পূর্ণ নাটক বা চিত্রনাট্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার আগ্রহ ছিল তাঁর। এই কাজের পদ্ধতির একটি স্মরণীয় ঘটনা তুলে ধরেছেন পরিচালক অয়ন চক্রবর্তী।
অয়ন জানিয়েছেন, প্রায় দু’বছর আগে একটি ওয়েব সিরিজের প্রস্তুতির সময় পঙ্কজ মুন্সী নিজেই তাঁকে ফোন করেছিলেন। নিজের চরিত্রের দৃশ্যের স্ক্রিপ্ট হাতে পাওয়ার পরও তিনি পুরো চিত্রনাট্য পড়তে চেয়েছিলেন। সেই আগ্রহ থেকেই পরিচালকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কথোপকথন হয়। পরবর্তী সময়ে পেশাগত সম্পর্ক আরও ব্যক্তিগত স্নেহের জায়গায় পৌঁছেছিল।
অয়নের স্মৃতিতে, বয়সজনিত দুর্বলতা এলেও পঙ্কজ মুন্সীর অভিনয়প্রতিভা অমলিন ছিল। কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ এবং নতুন কিছু শেখার বা বোঝার ইচ্ছা শেষ বয়সেও যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।
## ‘ঋণশোধ’ নাটকের স্মৃতিও ফিরে এল
পঙ্কজ মুন্সীর প্রয়াণের পর তাঁর সঙ্গে কাজের পুরনো স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন অভিনেতা দেবপ্রতীম দাশগুপ্তও। প্রয়াত শিল্পীর পরিবারের সঙ্গে একটি ছবি শেয়ার করে তিনি আবেগঘন বার্তায় জানান, ছোটবেলায় পঙ্কজ মুন্সীর নির্দেশনায় ‘ঋণশোধ’ নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন।
এই স্মৃতি থেকেই স্পষ্ট, শুধু নিজের প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গেই নয়, পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতাদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও পঙ্কজ মুন্সীর ভূমিকা ছিল। মঞ্চের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহু শিল্পীর স্মৃতিতে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
## মঞ্চ ছাড়িয়ে সিনেমাতেও রেখেছেন ছাপ
থিয়েটার ছিল তাঁর মূল পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হলেও বড় পর্দাতেও অভিনয়ের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন পঙ্কজ মুন্সী। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ এবং ‘শজারুর কাঁটা’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়। ফলে মঞ্চের দর্শকদের পাশাপাশি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছেও তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন।
বাংলা সিনেমা ও নাটকের দুই জগতের মধ্যে যে শিল্পীরা নিয়মিত যাতায়াত করেছেন, পঙ্কজ মুন্সী তাঁদেরই একজন। তাঁর অভিনয়ে মঞ্চের অভিজ্ঞতা এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছনোর প্রবণতা পর্দাতেও প্রতিফলিত হয়েছে।
## সহকর্মীদের শ্রদ্ধা, শোক টলিপাড়ায়
পঙ্কজ মুন্সীর মৃত্যুসংবাদে শোক প্রকাশ করেছেন পরিচালক অয়ন চক্রবর্তী, অভিনেতা দেবপ্রতীম দাশগুপ্ত-সহ তাঁর বহু সহকর্মী। তাঁদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে এমন একজন শিল্পীর ছবি, যাঁর শরীর দুর্বল হলেও অভিনয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা শেষ দিন পর্যন্ত কমেনি।
প্রয়াত শিল্পীর পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের প্রতিও সমবেদনা জানিয়েছেন সহকর্মীরা। বিশেষ করে ‘অর্ধাঙ্গিনী’ খ্যাত অভিনেত্রী তপতী মুন্সী এবং পরিবারের প্রতি শোকবার্তা জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক জগতের মানুষজন।
পঙ্কজ মুন্সীর প্রয়াণে বাংলা থিয়েটারের যে শূন্যতা তৈরি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর কাজ, নাট্যচর্চার প্রতি নিষ্ঠা এবং পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দীর্ঘদিন স্মরণে থাকবে। মঞ্চ ও পর্দায় তাঁর রেখে যাওয়া কাজই এবার তাঁর স্মৃতির অন্যতম উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।


