দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান। অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের মূলপর্বে ফের জায়গা করে নিল ভারত। রবিবার তাসখন্দের দোস্তলিক স্টেডিয়ামে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বাংলাদেশকে ৩-০ গোলে হারিয়ে যোগ্যতা অর্জনের পথে বড় পদক্ষেপ করেছিল ভারতের অনূর্ধ্ব-২০ দল। পরে উজবেকিস্তান সিরিয়াকে ২-০ গোলে হারাতেই ভারতের যোগ্যতা নিশ্চিত হয়ে যায়। ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ বি-তে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে মহেশ গাওলির দল।
এর আগে শেষবার ভারত অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলেছিল ২০০৬ সালে। সেই বছর ভারতই ছিল আয়োজক। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মূলপর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি দেশের যুব ফুটবল দল। এবার সেই খরা কাটিয়ে চিনে হতে চলা ২০২৭ সালের প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিল ‘ব্লু কল্টস’রা।
### বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দাপুটে জয়
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ম্যাচটি ভারতের কাছে ছিল কার্যত মরণ-বাঁচন লড়াই। প্রথম ম্যাচে সিরিয়াকে ১-০ গোলে হারানোর পর দ্বিতীয় ম্যাচে আয়োজক উজবেকিস্তানের কাছে ০-৪ ব্যবধানে হেরে গিয়েছিল ভারত। ফলে শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জয়ের পাশাপাশি গ্রুপের অন্য ম্যাচের ফলের দিকেও তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল তাদের।
তবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে ভারত। ম্যাচের ২৫ মিনিটে ড্যানি মেইতেই লাইশরামের গোলে এগিয়ে যায় তারা। বাংলাদেশের ডিফেন্সে চাপ তৈরি করে বল কেড়ে নেওয়ার পর আক্রমণ তৈরি করে ভারত। শেষ পর্যন্ত বক্সের মধ্যে সুযোগ পেয়ে ড্যানি নিখুঁতভাবে বল জালে পাঠান।
### দুরন্ত ব্যাকভলিতে বিশালের গোল
প্রথমার্ধে এক গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় ভারত। দ্বিতীয়ার্ধে ফের আক্রমণের ঝড় তোলে তারা। ম্যাচের ৬০ মিনিটে আসে দ্বিতীয় গোল।
লম্বা থ্রো-ইন বাংলাদেশের বক্সে ঢোকার পর বলটি বিশাল যাদবের পিছনের দিকে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে শরীরকে শূন্যে ভাসিয়ে দুরন্ত ব্যাকভলিতে বল জালে পাঠান উত্তরপ্রদেশের ১৮ বছর বয়সি এই ফুটবলার। গোলটি শুধু ভারতের লিড দ্বিগুণ করেনি, ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্তও হয়ে ওঠে।
### ৭৯ মিনিটে তৃতীয় গোল
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভারতীয় রক্ষণভাগ তাদের কোনও বড় সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি। বরং পালটা আক্রমণে আরও একবার বাংলাদেশের ডিফেন্সকে চাপে ফেলে ভারত।
৭৯ মিনিটে পরিবর্ত হিসেবে নামা মহম্মদ আরবাশ ভারতের হয়ে তৃতীয় গোলটি করেন। নিজেদের বক্স থেকে আক্রমণ শুরু করে একাধিক পাসে বাংলাদেশের রক্ষণ ভেঙে ফেলে ভারত। শেষ পর্যন্ত বাঁ পায়ের জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে দেন আরবাশ। ম্যাচের ফল তখন কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়।
### উজবেকিস্তানের জয়ে নিশ্চিত হল ভারতের টিকিট
বাংলাদেশকে ৩-০ গোলে হারানোর পরও ভারতের অপেক্ষা শেষ হয়নি। কারণ গ্রুপ বি-তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলগুলির মধ্যে সেরা সাতটি দলই মূলপর্বে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছিল। ফলে ভারতের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উজবেকিস্তান বনাম সিরিয়া ম্যাচ।
সেই ম্যাচেও ভারতের পক্ষে আসে কাঙ্ক্ষিত ফল। উজবেকিস্তান সিরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপের শীর্ষস্থান ধরে রাখে। ফলে উজবেকিস্তানের পয়েন্ট দাঁড়ায় ৯ এবং ভারত ৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে। সিরিয়ার সংগ্রহ ৩ পয়েন্ট, আর তিন ম্যাচেই হেরে বাংলাদেশের অভিযান শেষ হয়।
### ২০২৭ সালে চিনে এশিয়ান কাপ
এই যোগ্যতার ফলে ২০২৭ সালের মার্চে চিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া AFC U20 Asian Cup-এর মূলপর্বে খেলবে ভারত। প্রতিযোগিতাটি ২৪ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চলার কথা। এবারের যোগ্যতা পর্বে আটটি গ্রুপের বিজয়ী দল এবং সাতটি সেরা রানার্স-আপ মূলপর্বে জায়গা পেয়েছে।
ভারতের জন্য এই সাফল্যের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ ২০০৬ সালের পর থেকে যুব এশিয়ান কাপের মূলপর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি তারা। গতবার অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রতিযোগিতায়ও অল্পের জন্য যোগ্যতা হাতছাড়া হয়েছিল। এবার অবশ্য শেষ ম্যাচে চাপ সামলে সেই ভুল আর করেনি মহেশ গাওলির দল।
### বিশ্বকাপের দরজাও খুলতে পারে
২০২৭ সালের অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ শুধু এশিয়ার মঞ্চে লড়াইয়ের সুযোগ নয়, বিশ্বকাপের দরজাও খুলে দিতে পারে। মূলপর্বের সেরা চারটি দল ২০২৭ FIFA U20 World Cup-এ খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। ফলে ভারতের সামনে এখন আরও বড় লক্ষ্য—এশিয়ার সেরা চার দলের মধ্যে জায়গা করে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ তৈরি করা।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ৩-০ জয় তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। দীর্ঘ ২০ বছরের অপেক্ষা শেষ করে ভারতীয় যুব ফুটবলের জন্য নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হল। ড্যানি, বিশাল এবং আরবাশের গোলে তাসখন্দে লেখা হল সেই প্রত্যাবর্তনের গল্প। এবার নজর থাকবে ২০২৭ সালে চিনের মূলপর্বে ভারতের পারফরম্যান্সের দিকে।


