নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর এবার সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও জারি হল নতুন নিয়ম। বিশেষ করে বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় কাজ করতে যাওয়া বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাধ্যতামূলক করেছে নেপাল সরকার। দেশের তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের তরফে জানানো হয়েছে, বন্যা কবলিত ভোতে কোশি এবং ত্রিশূলী নদী সংলগ্ন এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে বিদেশি সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট সরকারি প্রক্রিয়া মেনে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড নিতে হবে।
নেপালের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এল, যখন ২৬ আগস্টের ভয়াবহ হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যায় দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত বিপর্যস্ত। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উদ্ধারকাজ, নিখোঁজদের সন্ধান এবং ক্ষয়ক্ষতির খবর সংগ্রহ করতে ইতিমধ্যেই বহু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক সেখানে পৌঁছেছেন।
### কী বলা হয়েছে নতুন নিয়মে?
নেপালের তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন সংক্রান্ত আলাদা নোটিস প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের অনলাইনে আবেদন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে।
বিদেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের কপি, বৈধ ভিসা বা প্রবেশের অনুমতি, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের পরিচয়পত্র এবং ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাংবাদিকের কাজের সম্পর্কের প্রমাণপত্রের মতো নথি প্রয়োজন হতে পারে। এর পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের তরফে সুপারিশপত্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশের বিদেশ মন্ত্রক, দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সুপারিশও চাওয়া হয়েছে বলে নেপালের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইনে আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পর সাংবাদিককে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ করে প্রেস প্রতিনিধির সার্টিফিকেট ও সাংবাদিক পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে হবে।
### ১৫ দিনের জন্য মিলবে অ্যাক্রেডিটেশন
বর্তমান নির্দেশ অনুযায়ী, বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের জন্য দেওয়া এই বিশেষ অ্যাক্রেডিটেশনের মেয়াদ ১৫ দিন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনুমতি নিয়ে সাংবাদিকদের কাজ করতে হবে। বিদেশি সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি হেল্প ডেস্ক রাখার কথাও জানিয়েছে নেপাল প্রশাসন।
তবে নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে স্থায়ীভাবে বিদেশি সাংবাদিকদের কাজ সীমিত করার নতুন আইন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এর আগে ‘The Kathmandu Post’-কে নেপালের তথ্য দপ্তরের মুখপাত্র গোবিন্দ প্রসাদ পাণ্ডে জানিয়েছিলেন, বিদেশি সাংবাদিকদের প্রেস পাস দেওয়ার ব্যবস্থা নতুন নয়; দীর্ঘদিন ধরেই সংশ্লিষ্ট নিয়ম রয়েছে। বর্তমান দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সেই প্রক্রিয়াই আরও স্পষ্টভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
### কেন এই সময়েই কড়াকড়ি?
২৬ আগস্ট ভোতে কোশি নদী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার পর নেপালের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে। হিমবাহ ধস থেকে তৈরি বিপুল জল, কাদা ও পাথরের স্রোতে বহু বাড়িঘর, রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিন-নেপাল সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চলগুলিও এই বিপর্যয়ের বড় ধাক্কা খেয়েছে।
নেপালের প্রশাসনের কাছে এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা এবং উদ্ধারকাজের সঙ্গে সাংবাদিকদের চলাচল সমন্বয় করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন প্রোটোকলে সাংবাদিকদের বৈধ প্রেস পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা এবং নিরাপত্তা ও উদ্ধারকারী দলের নির্দেশ মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
### বিদেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বন্যার মতো বিপর্যয়ের সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ মানুষ, দুর্গতদের অবস্থা, উদ্ধার অভিযান এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার খবর বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন সাংবাদিকরা। ফলে নতুন অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থার কারণে বিদেশি সাংবাদিকদের আগে থেকেই প্রয়োজনীয় অনুমতি সংগ্রহ করতে হবে।
আগস্টের শেষ সপ্তাহেই নেপাল সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নথিপত্র জমা এবং প্রেস পাস নেওয়ার প্রক্রিয়া স্পষ্ট করেছিল। তখন প্রশাসনের তরফে বলা হয়েছিল, বিদেশি সাংবাদিকদের দ্রুত পরিষেবা দিতে সরকারি দপ্তর ছুটির দিনেও খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
### ‘চিনের চাপ’ নিয়ে জল্পনা, সরকারের ব্যাখ্যা নেই
নতুন নিয়ম ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, উত্তর নেপালের বন্যাকবলিত অঞ্চল চিনের তিব্বত সীমান্তের কাছে হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণ এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে থাকতে পারে। সাংবাদিকদের পরিচয়ে কেউ সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে এই বিষয়ে নেপাল সরকার প্রকাশ্যে চিনের চাপ বা কোনও নির্দিষ্ট দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগকে কারণ হিসেবে ঘোষণা করেনি। বরং সরকারি নথি ও নেপালের কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান ব্যবস্থাকে দুর্যোগকেন্দ্রিক রিপোর্টিংয়ের সময় বিদেশি সাংবাদিকদের কাজকে নিয়মের আওতায় আনার পদক্ষেপ হিসেবেই তুলে ধরা হচ্ছে।
### ভয়াবহ বন্যার মধ্যেই তথ্য সংগ্রহে নতুন কাঠামো
নেপালের ভয়াবহ বন্যায় এখনও উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধানের কাজ চলছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে বিপর্যয়ের মাত্রা এতটাই বেশি যে উদ্ধারকারী দলগুলিকে দুর্গম ভূখণ্ডে কাজ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তা, সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজও চলছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য বাধ্যতামূলক অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, তা এখন দেখার বিষয়। প্রশাসনের দাবি, নিয়ম মেনে সাংবাদিকদের কাজের সুযোগ থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তাও দেওয়া হবে। তবে দুর্যোগের খবর দ্রুত বিশ্বের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলির।


