বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমারের নাম শুধু একজন অভিনেতার পরিচয় নয়, বরং বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ এবং নস্টালজিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক অধ্যায়। মহানায়কের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে এবার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েই মঙ্গলবার নন্দনে বসে বিশেষ উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একাধিক পরিচিত মুখ। জন্মশতবর্ষকে শুধুমাত্র একটি দিনের অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরভর নানা কর্মসূচির মাধ্যমে উত্তম কুমারের স্মৃতি এবং কাজকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল, উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সেপ্টেম্বরের ৩ থেকে ৬ তারিখ পর্যন্ত একাধিক অনুষ্ঠান হবে। মঙ্গলবার নন্দনে আয়োজিত বৈঠকে সেই কর্মসূচির বিস্তারিত রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী ছাড়াও টলিউডের একাধিক অভিনেতা, পরিচালক ও শিল্পী বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জিৎ, দেব, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ এবং যিশু সেনগুপ্তের মতো তারকাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
### ৩ সেপ্টেম্বর থেকেই শুরু বিশেষ কর্মসূচি
জন্মশতবর্ষের মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে ৩ সেপ্টেম্বর। সকালেই টালিগঞ্জে উত্তম কুমারের মূর্তিতে মাল্যদান করা হবে। এরপর বিজলী সিনেমার সামনে মহানায়কের একটি বিশাল ২০ ফুটের কাটআউট উন্মোচনের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে উত্তম কুমারের স্মৃতি ও চলচ্চিত্রজীবনকে তুলে ধরার জন্য একাধিক অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সন্ধ্যা ৬টায় নন্দন চত্বর থেকে বের হবে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি পদযাত্রা। এই পদযাত্রায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী। টলিউডের শিল্পী, চলচ্চিত্রপ্রেমী এবং উত্তম অনুরাগীদেরও এই পদযাত্রায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এটি শুধুমাত্র সরকারি অনুষ্ঠান না হয়ে সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
### উত্তমের স্মৃতিতে শহরজুড়ে চলবে বিশেষ গাড়ি
মহানায়কের স্মৃতিকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিতে শহরজুড়ে একটি অভিনব গাড়ি চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বিশেষ উদ্যোগের সূচনা করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জিৎ এবং রুদ্রনীল ঘোষ। উত্তম কুমারের জীবন, অভিনয় এবং বাংলা সিনেমায় তাঁর অবদানকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটি তথ্যচিত্র তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তম কুমারকে নিয়ে এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট পরিসরে তথ্যচিত্র তৈরি হয়নি। তাই বছরব্যাপী উদযাপনের অংশ হিসেবে তাঁর জীবন ও কর্মকে নতুনভাবে নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে সিনেমা দেখতে আসা দর্শকদের জন্যও রাখা হয়েছে অভিনব ভাবনা। উত্তম কুমারের মতো সাজসজ্জা করে অথবা সুচিত্রা সেনের কোনও জনপ্রিয় চরিত্রের আদলে সেজে সিনেমা দেখতে এলে সেরাদের পুরস্কৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
### বছরভর প্রদর্শনী, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি
জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে শুধু সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানেই থেমে থাকতে চাইছে না রাজ্য সরকার। উত্তম কুমারের জীবন, অভিনয় এবং বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। নন্দন চত্বরে তাঁর বিরল ছবি, সিনেমার পোস্টার এবং বিভিন্ন স্মারক প্রদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ, গবেষক, শিল্পী ও সমালোচকদের নিয়ে আলোচনা সভা ও সেমিনারের আয়োজন করা হবে।
সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে নিউটাউনে ‘উত্তমকুমার জন্ম শতবার্ষিকী ফিল্ম সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে দক্ষিণ কলকাতা পৌরসভার পরিচালিত উত্তম মঞ্চের সৌন্দর্যায়ন ও আধুনিকীকরণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে তোলার পাশাপাশি উত্তম কুমারের নামে স্থায়ী সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
### নতুন প্রজন্মের কাছে মহানায়ককে পৌঁছে দেওয়াই লক্ষ্য
উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়। তাঁর সিনেমা, অভিনয়শৈলী এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবকে নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক পরিকল্পনায় প্রবীণ দর্শকদের নস্টালজিয়ার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের জন্য আধুনিক মাধ্যম ও নতুন ধরনের উপস্থাপনার কথাও উঠে এসেছে। ফলে উত্তম কুমারের শতবর্ষ উদযাপন প্রজন্মের ব্যবধান কমিয়ে তাঁর উত্তরাধিকারকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার একটি প্রচেষ্টা হয়ে উঠতে পারে।
বাংলার চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের প্রভাব আজও অমলিন। তাঁর অভিনীত ছবি, চরিত্র, সংলাপ, পোশাক এবং ব্যক্তিত্ব এখনও বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে জীবন্ত। সেই কারণেই জন্মের ১০০ বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি আয়োজন নিছক একটি সরকারি অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলা সিনেমার এক স্বর্ণযুগকে নতুন করে স্মরণ করার উদ্যোগ। ৩ থেকে ৬ সেপ্টেম্বরের মূল কর্মসূচির পরও বছরজুড়ে চলবে নানা অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী, আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন।


