ক্রিকেট মাঠে সাধারণত আন্তর্জাতিক ম্যাচ শুরুর আগে দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। কিন্তু ভারত ও আফগানিস্তানের প্রথম টি-২০ ম্যাচের আগে দেখা গেল একেবারে অন্যরকম দৃশ্য। দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে ভারতীয় জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর আগে পরিবেশন করা হল জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক ম্যাচ শুরুর আগে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল বলে জানা গিয়েছে।
রবিবার দিল্লিতে ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজের প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের ক্রিকেটাররা মাঠে দাঁড়িয়ে এই বিশেষ পরিবেশনে অংশ নেন। প্রথমে গাওয়া হয় ‘বন্দে মাতরম’, তারপর প্রচলিত নিয়মে পরিবেশন করা হয় ‘জন গণ মন’। এই ঘটনায় স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে দেশাত্মবোধের আবেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
## জাতীয় সংগীতের আগে জাতীয় গান
ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’। অন্যদিকে ‘বন্দে মাতরম’ দেশের জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃত। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ‘বন্দে মাতরম’ দেশবাসীর মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিল। বহু বছর ধরে জাতীয় গান ও জাতীয় সংগীত—দুইয়েরই আলাদা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে এতদিন সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের জাতীয় সংগীতই পরিবেশন করা হত। ভারত-আফগানিস্তান ম্যাচের আগে সেই প্রথায় পরিবর্তন দেখা গেল। প্রথমে ‘বন্দে মাতরম’ এবং তার পর ‘জন গণ মন’ পরিবেশন করা হয়। ফলে ম্যাচ শুরুর আগেই তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগকে দেশের জাতীয় প্রতীক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতি সম্মান জানানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাঠে উপস্থিত ভারতীয় ক্রিকেটারদের পাশাপাশি আফগানিস্তানের খেলোয়াড়রাও এই সময় সম্মান প্রদর্শন করেন।
## কেন্দ্রীয় নির্দেশের পর নতুন প্রথা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন নির্দেশিকার পর সরকারি অনুষ্ঠান ও নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক আয়োজনে ‘বন্দে মাতরম’কে ‘জন গণ মন’-এর আগে পরিবেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশের প্রভাবই এবার ক্রিকেট মাঠেও দেখা গেল।
আগে কোনও সরকারি অনুষ্ঠানে যদি জাতীয় গান ও জাতীয় সংগীত—দুটিই পরিবেশন করা হত, তাহলে কোনটি আগে হবে, তা নিয়ে নির্দিষ্ট প্রথা সব ক্ষেত্রে একরকম ছিল না। নতুন নির্দেশিকায় ‘বন্দে মাতরম’ আগে এবং ‘জন গণ মন’ পরে পরিবেশনের কথা বলা হয়েছে। দিল্লির এই ক্রিকেট ম্যাচে সেই নিয়মই অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এতে ক্রিকেট ম্যাচের প্রাক্-অনুষ্ঠানেও জাতীয় প্রতীকগুলির ব্যবহারে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আগামী দিনে দেশের মাটিতে আয়োজিত অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাতেও এই প্রথা দেখা যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
## অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে আবেগঘন পরিবেশ
ভারত ও আফগানিস্তানের ম্যাচ ঘিরে দিল্লিতে আগে থেকেই যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। তার উপর ম্যাচ শুরুর আগে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন হওয়ায় দর্শকদের মধ্যে উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। স্টেডিয়ামে উপস্থিত ক্রিকেটপ্রেমীরা জাতীয় গানের সময় সম্মান প্রদর্শন করেন। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় দুই দলের খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফরাও মাঠে দাঁড়িয়ে থাকেন।
ভারতীয় ক্রিকেট দলের জন্যও এটি ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক ম্যাচে ক্রিকেটাররা সাধারণত জাতীয় সংগীতের সময় মাঠে দাঁড়ান। কিন্তু জাতীয় সংগীতের আগে জাতীয় গান পরিবেশনের ঘটনা তাঁদের সামনে প্রথমবার ঘটল। ফলে ম্যাচ শুরুর আগের অনুষ্ঠানটি নিজেই হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক।
এই ঘটনা শুধু ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যেই নয়, সামাজিক মাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ জাতীয় গান ও জাতীয় সংগীতের আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের ধরন নিয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন। তবে ম্যাচের আগে দেশাত্মবোধক আবহ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
## ‘বন্দে মাতরম’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এর অংশ হিসেবে এই গান প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গানটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে এই গান আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম এবং মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধার অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছিল। জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরম’-এরও দেশের ইতিহাসে বিশেষ স্থান রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের মতো বড় মঞ্চে এই গান পরিবেশনের সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
‘বন্দে মাতরম’ শুধু একটি গান নয়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে জড়িত একটি প্রতীক। সেই কারণে ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলায় এই গান পরিবেশিত হওয়ায় বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে।
## ম্যাচের আগে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
ভারত-আফগানিস্তান প্রথম টি-২০ ম্যাচে টস জিতে ভারত প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতীয় দলের নেতৃত্বে ছিলেন শ্রেয়স আইয়ার। আফগানিস্তান দলের অধিনায়ক ছিলেন ইব্রাহিম জাদরান। দুই দলেই অভিজ্ঞ ও তরুণ ক্রিকেটারদের সংমিশ্রণ ছিল।
ম্যাচের আগে ভারতীয় দলের একাদশ নিয়েও আগ্রহ ছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে। অভিষেক শর্মা ও সঞ্জু স্যামসনকে ওপেনিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে আফগানিস্তান দলে রশিদ খান, মহম্মদ নবি এবং আজমতুল্লাহ উমরজাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার ছিলেন।
তবে ম্যাচ শুরুর আগের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন। ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের আগে জাতীয় গান ও জাতীয় সংগীতের এই আয়োজন ম্যাচটিকে আলাদা গুরুত্ব এনে দেয়।
## আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন নজির
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের রীতি বহু পুরনো। কিন্তু জাতীয় সংগীতের আগে জাতীয় গান পরিবেশনের ঘটনা বিরল। ভারত-আফগানিস্তান প্রথম টি-২০ ম্যাচে এই নতুন আয়োজন ভারতীয় ক্রিকেটে একটি নজির তৈরি করল।
এখন প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দলের ম্যাচেও কি একই প্রথা অনুসরণ করা হবে? কারণ এই ম্যাচটি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হলেও আফগানিস্তান ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজক দল। ফলে দেশের বাইরে ভারতীয় দলের ম্যাচের ক্ষেত্রেও ‘বন্দে মাতরম’ আগে পরিবেশনের নিয়ম চালু হতে পারে বলে জল্পনা শুরু হয়েছে।
যদিও প্রতিটি দেশের নিজস্ব প্রোটোকল ও আয়োজক সংস্থার নিয়ম থাকে, তবুও দিল্লির এই আয়োজন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে জাতীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
## ক্রিকেটের বাইরে দেশাত্মবোধের বার্তা
ভারতীয় ক্রিকেটে দেশপ্রেমের আবেগ নতুন নয়। জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা এবং দেশের হয়ে খেলতে নামা—সবকিছুর সঙ্গেই ক্রিকেটার ও সমর্থকদের আবেগ জড়িয়ে থাকে। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় সংগীতের আগে পরিবেশন করা সেই আবেগকে আরও দৃশ্যমান করে তুলল।
ভারত-আফগানিস্তান ম্যাচের আগে এই ঐতিহাসিক আয়োজন দেখিয়ে দিল, ক্রিকেট শুধু ব্যাট-বলের লড়াই নয়; অনেক সময় তা জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি এবং আবেগ প্রকাশেরও বড় মঞ্চ হয়ে ওঠে। অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামের এই ঘটনা ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


