দলীপ ট্রফির ফাইনালে ব্যাট হাতে ঝড় তোলার পর মাঠের বাইরেও সমর্থকদের মন জয় করলেন ভারতীয় ক্রিকেটের তরুণ বিস্ময় বৈভব সূর্যবংশী। চেন্নাইয়ের এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়াম, অর্থাৎ চেপকে ইস্ট জোনের হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের বিরুদ্ধে খেলতে নেমেছিলেন ১৫ বছরের এই ক্রিকেটার। মাত্র ৩৭ বলে ৪৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে আউট হওয়ার পরও তাঁর প্রতি দর্শকদের উন্মাদনায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। বরং খেলা শেষে গ্যালারির কাছে গিয়ে ভক্তদের সঙ্গে দেখা করে, অটোগ্রাফ দিয়ে এবং তাঁদের আবদার মিটিয়ে আরও একবার সবার মন জয় করে নেন বৈভব।
চেপকে তাঁর জন্য যে বিশেষ আবেগ তৈরি হয়েছিল, তার পিছনে রয়েছে একটি আলাদা গল্পও। IPL-এ রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে নজর কেড়েছেন বৈভব। কিন্তু গত দুই মরশুমে রাজস্থান রয়্যালস চেপকে ম্যাচ না খেলায় চেন্নাইয়ের দর্শকদের অনেকেই তাঁকে সরাসরি মাঠে দেখার সুযোগ পাননি। দলীপ ট্রফির ফাইনাল তাই তাঁদের কাছে তরুণ তারকাকে সামনে থেকে দেখার বিশেষ সুযোগ হয়ে ওঠে।
## ব্যাট হাতে শুরুতেই ঝড়
ফাইনালের প্রথম দিন ইস্ট জোনের হয়ে ওপেন করতে নেমেছিলেন বৈভব সূর্যবংশী। তাঁর সঙ্গী ছিলেন অভিমন্যু ঈশ্বরন। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে দেখা যায় বৈভবকে। দক্ষিণাঞ্চলের বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন তিনি।
বিশেষ করে অভিজ্ঞ ভারতীয় পেসার মহম্মদ সিরাজের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যাটিং ছিল নজরকাড়া। সিরাজের এক ওভারে বৈভব বাউন্ডারি মেরে দর্শকদের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেন। তরুণ বাঁহাতি ব্যাটারের আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে চেপকের গ্যালারি থেকে একের পর এক উচ্ছ্বাসের আওয়াজ শোনা যায়।
শেষ পর্যন্ত ৩৭ বলে ৪৪ রান করেন বৈভব। তাঁর ইনিংসে ছিল একাধিক বাউন্ডারি ও ছক্কা। যদিও অর্ধশতরান থেকে মাত্র কয়েক রান দূরে থেমে যেতে হয় তাঁকে, তবুও তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং প্রথম দিনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।
## ব্যাটিং শেষ, শুরু অন্য রকম ‘ইনিংস’
মাঠের পারফরম্যান্সের পরই আসে দিনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত। বৈভব যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন তাঁকে ঘিরে ধরেন বহু সমর্থক। কারও হাতে ছিল জার্সি, কেউ চেয়েছেন অটোগ্রাফ, আবার কেউ শুধুই প্রিয় ক্রিকেটারের সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত কাটানোর সুযোগ খুঁজছিলেন।
সাধারণত ম্যাচ শেষে ক্রিকেটাররা ড্রেসিংরুমের দিকে চলে যান। কিন্তু বৈভব সমর্থকদের হতাশ করেননি। তিনি তাঁদের কাছে এগিয়ে যান এবং বেশ কিছুক্ষণ ধরে অটোগ্রাফ দেন। সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের আবদারও শোনেন। তাঁর এই স্বাভাবিক ও বিনয়ী আচরণই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
## চেপকে কেন এত জনপ্রিয় বৈভব?
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বৈভব সূর্যবংশী ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত তরুণ মুখ হয়ে উঠেছেন। IPL-এ তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিং ইতিমধ্যেই দর্শকদের নজর কেড়েছে। তবে লাল বলের ক্রিকেটেও তিনি নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন।
দলীপ ট্রফির সেমিফাইনালে সেন্ট্রাল জোনের বিরুদ্ধে ৮১ বলে ৯২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন বৈভব। সেই ইনিংসে ছিল সাতটি চার ও সাতটি ছক্কা। ওই ম্যাচে মাত্র ১৫ বছর ১৫৭ দিন বয়সে দলীপ ট্রফির ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে অর্ধশতরান করার নজির গড়েন তিনি।
ফলে ফাইনালের আগে থেকেই চেন্নাইয়ের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে প্রবল আগ্রহ ছিল। বিনামূল্যে দর্শকদের মাঠে প্রবেশের সুযোগ থাকায় চেপকে তাঁর জন্য দর্শকদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য।
## শুধু তারকা নন, ভক্তদের কাছের মানুষও
বৈভবের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তাঁর ক্রিকেটীয় প্রতিভা। কিন্তু সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর এমন সহজ ব্যবহার সেই জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঠে ভয়ডরহীন ব্যাটিং এবং মাঠের বাইরে ভক্তদের সময় দেওয়া—দুই বিপরীত দিকের এই মিশ্রণই তরুণ ক্রিকেটারকে নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ আরও বাড়াচ্ছে।
চেন্নাইয়ের সমর্থকদের জন্য মুহূর্তটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছিল কারণ তাঁরা শুধু বৈভবের ব্যাটিং দেখেননি, ম্যাচের পর তাঁকে একেবারে কাছ থেকেও পেয়েছেন। অনেক সমর্থক তাঁর অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেছেন, কেউ ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছেন। এই ছোট্ট ঘটনাই দিনের শেষে ম্যাচের ফলাফলের বাইরেও আলোচনায় উঠে আসে।
## দলীপ ট্রফি থেকে জাতীয় দলের স্বপ্ন
বৈভবের সামনে এখন দীর্ঘ ক্রিকেটজীবন পড়ে রয়েছে। এত অল্প বয়সে তাঁর প্রতিভা নিয়ে আলোচনা হলেও লাল বলের ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হবে তাঁর পরবর্তী বড় পরীক্ষা। দলীপ ট্রফির মতো প্রতিযোগিতা তাঁকে সিনিয়র ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।
চেপকে সিরাজের মতো আন্তর্জাতিক মানের বোলারের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে শট খেলা তাঁর আত্মবিশ্বাসেরই পরিচয়। তবে একইসঙ্গে ৪৪ রানকে বড় ইনিংসে পরিণত করতে না পারাও তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা দেবে।
এই মুহূর্তে তাই বৈভবকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন বাড়ছে, তেমনই তাঁর ক্রিকেটীয় পরিণতিও নজরে রাখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—চেপকের গ্যালারিতে তাঁর যে জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে, তা শুধুমাত্র রান বা রেকর্ডের জন্য নয়। মাঠের বাইরে সমর্থকদের প্রতি তাঁর সেই আন্তরিক আচরণও তরুণ তারকার জনপ্রিয়তার বড় কারণ হয়ে উঠেছে।


