আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বড়সড় আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকানরা যদি নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে ৫,০০০ ডলার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এই অর্থকে ‘Trump Dividend’ হিসেবে তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে এই মুহূর্তে এটি কোনও অনুমোদিত সরকারি প্রকল্প নয়; কীভাবে অর্থ দেওয়া হবে, তার আইনি কাঠামো কী হবে এবং অর্থের উৎস কী—সেসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
### কংগ্রেস নির্বাচনের আগে বড় ঘোষণা
ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির প্রথম মেজর মিডটার্ম কনভেনশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই প্রতিশ্রুতি দেন ট্রাম্প। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সেনেটের একাংশে ভোট হবে।
ট্রাম্পের বক্তব্য, রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসের দুই কক্ষ—হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেট—দখলে রাখতে পারে, তাহলে দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের জন্য সরাসরি আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই ঘোষণাকে আসন্ন নির্বাচনের আগে ভোটারদের আকৃষ্ট করার বড় প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
### প্রত্যেকে পাবেন ৫,০০০ ডলার?
ট্রাম্পের ঘোষণার সবচেয়ে বড় চমক এখানেই। তাঁর প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রায় ২৭ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান এর আওতায় আসতে পারেন। সেই হিসেবে মোট খরচ দাঁড়াতে পারে আনুমানিক **১.৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার**। অর্থাৎ এটি মার্কিন সরকারের জন্য অত্যন্ত বড় আর্থিক দায় তৈরি করতে পারে।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পরই প্রশ্ন উঠেছে—এত বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসবে? কীভাবে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্ধারণ করা হবে? কবে থেকে টাকা দেওয়া হবে? এই সমস্ত বিষয়ে এখনও বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
### টাকার উৎস কি শুল্ক থেকে?
ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর শুল্কনীতির যোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি অতীতে আমদানি শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব ব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ধারণা সামনে এনেছিলেন। এবারও ‘Trump Dividend’ নিয়ে সেই ধরনের অর্থনৈতিক যুক্তি সামনে এসেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের বড় প্রশ্ন হল, শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব দিয়ে ৫,০০০ ডলার করে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে অর্থ দেওয়া বাস্তবে কতটা সম্ভব। Associated Press-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্কের আয় প্রস্তাবিত অর্থের মোট ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট নাও হতে পারে।
### একসঙ্গে খরচ হতে পারে ১ ট্রিলিয়নের বেশি
প্রায় ২৭ কোটি প্রাপ্তবয়স্ককে ৫,০০০ ডলার করে দিলে হিসাব অনুযায়ী খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১.৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ অর্থ মার্কিন ফেডারেল বাজেটের উপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যেই দেশের ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে আমেরিকায় রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র।
ফলে ট্রাম্পের ঘোষণার পর অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরাসরি নগদ অর্থ বিতরণ করলে মুদ্রাস্ফীতির উপর তার কী প্রভাব পড়বে, সরকারের ঋণের বোঝা কতটা বাড়বে এবং এর জন্য কংগ্রেসের কী ধরনের অনুমোদন প্রয়োজন হবে—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
### ধনীদের বাদ দেওয়া হতে পারে?
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কিছুটা আলাদা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই পরিকল্পনায় ধনী আমেরিকানদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। অর্থাৎ ট্রাম্পের বক্তব্যে ‘প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান’-এর কথা বলা হলেও বাস্তব নীতিতে আয়ভিত্তিক যোগ্যতার শর্ত যুক্ত হতে পারে।
এখনও অবশ্য এ বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সরকারি নীতি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কে টাকা পাবেন এবং কারা বাদ পড়বেন, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
### এর আগে ২,০০০ ডলারের প্রতিশ্রুতিও ছিল
এটি ট্রাম্পের প্রথম ‘ডিভিডেন্ড’ ধরনের আর্থিক প্রতিশ্রুতি নয়। এর আগে তিনি শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব ব্যবহার করে প্রায় ২,০০০ ডলার পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। আবার সরকারি খরচ কমানোর মাধ্যমে ‘DOGE dividend’-এর কথাও সামনে এসেছিল। তবে সেই প্রস্তাবগুলি বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
এবারের ঘোষণার বিশেষত্ব হল, ৫,০০০ ডলারের প্রতিশ্রুতিকে সরাসরি রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
### ভোটের সঙ্গে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি—আইনি প্রশ্ন
ঘোষণার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা এটিকে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা বলে সমালোচনা করতে পারে। তবে Associated Press-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেহেতু প্রস্তাবটি সর্বজনীনভাবে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের জন্য বলা হয়েছে এবং নির্দিষ্টভাবে কাউকে ভোট দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার কথা বলা হয়নি, তাই এটিকে সরাসরি অবৈধ ‘vote buying’ হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ নয়।
তবে রাজনৈতিকভাবে এই ঘোষণার প্রভাব আলাদা। কারণ নির্বাচনের ঠিক আগে সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি হাজার হাজার ডলার পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
### রিপাবলিকানদের সামনে কঠিন লড়াই
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প নিজেও তাঁর বক্তৃতায় নির্বাচনের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরেছেন। তিনি ভোটারদের এমনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যেন তাঁর নিজের নামও ব্যালটে রয়েছে।
অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার খরচ এবং ইরান যুদ্ধের মতো বিষয় নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ রয়েছে বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। ফলে রিপাবলিকানদের ভোটব্যাঙ্ককে উজ্জীবিত করতে ট্রাম্পের এই আর্থিক প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে।
### এখনও হাতে আসছে না ৫,০০০ ডলার
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—ট্রাম্পের ঘোষণা মানেই আমেরিকান নাগরিকদের জন্য এখনই ৫,০০০ ডলারের চেক তৈরি হচ্ছে না। এর জন্য প্রয়োজন হবে নির্দিষ্ট সরকারি নীতি, অর্থের উৎস নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও কংগ্রেসীয় প্রক্রিয়া।
তাই আপাতত এটিকে **নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি** হিসেবেই দেখা হচ্ছে। রিপাবলিকানরা নভেম্বরের নির্বাচনে দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ৫,০০০ ডলারের ‘Trump Dividend’ ঘোষণার মধ্যে যেমন রয়েছে বড় অঙ্কের আর্থিক প্রলোভন, তেমনই রয়েছে গুরুতর অর্থনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন। নির্বাচনের আগে এই প্রতিশ্রুতি মার্কিন রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হবে।


