বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিনের দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় প্রত্যাবর্তন এবং টুলু মণ্ডলকে ঘিরে চলা তদন্ত—এই দুই বিষয়কে সামনে রেখে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ শানালেন বিজেপির কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা দলের শীর্ষ নেতা সুকান্ত মজুমদার। এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস—উভয় সরকারের সমালোচনা করে দাবি করেন, অতীতে ‘তোষণের রাজনীতি’র কারণেই তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল।
সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্যে উঠে আসে তসলিমা নাসরিনের নির্বাসনের প্রসঙ্গ। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলিকে সন্তুষ্ট করার জন্য লেখিকাকে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য করেছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকলেও তাঁর ফিরে আসার পরিবেশ তৈরি হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অতীতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বিজেপি নেতার দাবি, বর্তমান প্রশাসনের উদ্যোগে তসলিমা নাসরিন নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়েছেন বলেই তিনি আবার কলকাতায় ফিরতে পেরেছেন। তাঁর মতে, কোনও লেখকের সাহিত্যকর্মের জন্য পুরস্কার পাওয়া এবং একই সঙ্গে নিজের বাসস্থান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হওয়া—এই দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে চলতে পারে না। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত। তবে এই বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে তাঁর রাজনৈতিক মতামত এবং অভিযোগ; এ বিষয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান আলাদা।
সাংবাদিক বৈঠকে সুকান্ত মজুমদার বামপন্থীদের ‘ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষ’ বা ‘সিউডো সেকুলার’ বলেও কটাক্ষ করেন। তাঁর অভিযোগ, অতীতে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে একপেশে নীতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং তার ফলেই তসলিমা নাসরিনের মতো লেখককে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, টুলু মণ্ডল প্রসঙ্গেও কড়া অবস্থানের কথা জানান সুকান্ত। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে এবং তদন্তকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। তাঁর দাবি, যারা বেআইনি উপায়ে সম্পদ অর্জন করেছে অথবা দেশের স্বার্থবিরোধী কোনও কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে তদন্ত চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও বিচারাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
বিজেপি নেতা আরও বলেন, অতীতে বিরোধী দলে থাকার কারণে অনেক অভিযোগ সামনে আনলেও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। এখন প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিত দেন যে, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং খনি-সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধেও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তসলিমা নাসরিন সম্প্রতি প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে এসে জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তিনি দীর্ঘ সময় শহরে থাকতে আগ্রহী। তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে কলকাতা পুলিশের তরফেও বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মাত্রা আরও বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন শুধু একটি সাংস্কৃতিক বা ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়কে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে টুলু মণ্ডলকে ঘিরে চলা তদন্তও আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলিকে প্রমাণিত হিসেবে ধরা উচিত নয়।
সুকান্ত মজুমদারের এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে বিজেপি এই ঘটনাগুলিকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে বিরোধীরা তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করছে। ফলে তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন এবং টুলু মণ্ডল-সংক্রান্ত তদন্ত—দুই বিষয়ই আগামী কয়েকদিন রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকবে।


