কলকাতা লিগের খেতাবি ম্যাচে মোহনবাগান ও মহামেডান স্পোর্টিংয়ের ম্যাচ ঘিরে বিতর্কের রেশ এবার পৌঁছে গেল আইএফএ শিল্ডেও। বিতর্কিত গোলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রয়োজনে আসন্ন আইএফএ শিল্ড বয়কট করার কথা ভাবতে পারে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্লাবের পক্ষ থেকে আইএফএ-র কাছে এই বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানানো হয়েছে। ফলে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে চলা ছয় দলের আইএফএ শিল্ডের আগে নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
ঘটনার সূত্রপাত কলকাতা ফুটবল লিগের ফাইনাল ম্যাচে। বারাসত স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল মোহনবাগান ও মহামেডান। ম্যাচটি ছিল সরাসরি লিগ খেতাব নির্ধারণের লড়াই। শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জিতে কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় মোহনবাগান। আট বছর পর সবুজ-মেরুন শিবির কলকাতা লিগের ট্রফি জেতে।
তবে ম্যাচের ফলের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রে আসে কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। মহামেডানের তরফে বিশেষ করে মোহনবাগানের একটি গোলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ক্লাবের অভিযোগ, ওই গোলের ক্ষেত্রে ম্যাচ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে আইএফএ-র কাছে নিজেদের অবস্থান জানায় মহামেডান। বিষয়টি সমাধান না হলে শিল্ডে অংশগ্রহণ নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে বলেও ক্লাবের তরফে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা লিগের ওই ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমার্ধে মোহনবাগান ২৬ মিনিটে সাহাল আবদুল সামাদের গোলে এগিয়ে যায়। পরে ৪২ মিনিটে লালরেমসাঙ্গা ফানাই মহামেডানের হয়ে সমতা ফেরান। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। ৫৯ মিনিটে মোহনবাগানের গোলরক্ষক দীপ্রভাত ঘোষ লাল কার্ড দেখেন। এরপর ৬৩ মিনিটে মহামেডানের মহিতোষ রায় পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।
দশজনের মোহনবাগানের বিরুদ্ধে তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ মহামেডানের হাতে ছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত ম্যাচের ফল বদলে যায়। ৭০ মিনিটে সাহাল নিজের দ্বিতীয় গোল করে স্কোর ২-২ করেন। এর মাত্র চার মিনিট পর সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় মোহনবাগানের হয়ে তৃতীয় গোল করেন। শেষ পর্যন্ত সেই গোলই ম্যাচের জয় নির্ধারণ করে এবং মোহনবাগান ৩-২ ব্যবধানে জিতে যায়।
মহামেডানের আপত্তির মূল জায়গা সেই শেষ গোলের সিদ্ধান্তকে ঘিরে। ক্লাবের বক্তব্য, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন রয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে আইএফএ-র সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছে মহামেডান। ক্লাবের অবস্থান অনুযায়ী, শুধু মাঠে প্রতিবাদ জানানো নয়, প্রয়োজনে পরবর্তী টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
আইএফএ শিল্ডের সূচি ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের প্রতিযোগিতায় মোট ছয়টি দল অংশ নিচ্ছে। দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে দলগুলিকে। গ্রুপ ‘এ’-তে রয়েছে ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান স্পোর্টিং এবং পাঞ্জাব এফসি। অন্যদিকে গ্রুপ ‘বি’-তে রয়েছে গতবারের চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান, শ্রীনিধি ডেকান এবং নর্থইস্ট ইউনাইটেড।
সূচি অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর মহামেডান ও ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্ব শুরু হওয়ার কথা। ২৫ সেপ্টেম্বর মহামেডানের প্রতিপক্ষ পাঞ্জাব এফসি। অর্থাৎ আইএফএ শিল্ডে মহামেডানের অন্তত দুটি গ্রুপ ম্যাচ নির্ধারিত রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ক্লাব যদি সত্যিই বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে প্রতিযোগিতার সূচি এবং গ্রুপের সমীকরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে মোহনবাগানও এবারের শিল্ডে গুরুত্বপূর্ণ দল। গতবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা গ্রুপ ‘বি’-তে রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর শ্রীনিধি ডেকানের বিরুদ্ধে তাদের প্রথম ম্যাচ এবং ২৯ সেপ্টেম্বর নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচ হওয়ার কথা। দুটি সেমিফাইনাল ২ অক্টোবর আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ফাইনালের নির্দিষ্ট দিন এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
আইএফএ শিল্ডের আয়োজন নিয়েও এ বছর একাধিক প্রশাসনিক বিষয় রয়েছে। ব্রাজিল ও উরুগুয়ের ম্যাচকে ঘিরে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকায় আইএফএ বিকল্প ভেন্যু হিসেবে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মহামেডানের মাঠের পাশাপাশি বারাসত স্টেডিয়াম এবং কিশোরভারতী স্টেডিয়াম ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। তবে সব ম্যাচের ভেন্যু এখনও চূড়ান্তভাবে জানানো হয়নি।
মহামেডানের সম্ভাব্য বয়কটের বিষয়টি তাই শুধু একটি ম্যাচের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতা ফুটবলে ম্যাচ পরিচালনা, রেফারিংয়ের সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে ক্লাবগুলির দীর্ঘদিনের আলোচনাও। তবে কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইএফএ-র সঙ্গে মহামেডানের আলোচনার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এদিকে কলকাতা লিগের ম্যাচের ফল ইতিমধ্যেই সরকারি ফলাফলে নথিভুক্ত হয়েছে এবং মোহনবাগান ৩-২ ব্যবধানে জয় নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ফলে ওই ম্যাচের ফল পরিবর্তনের কোনও প্রশ্ন এই মুহূর্তে নেই। বিতর্কের কেন্দ্র এখন মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় মহামেডানের অংশগ্রহণ।
আইএফএ শিল্ড শুরু হওয়ার আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। তাই মহামেডান শেষ পর্যন্ত মাঠে নামবে, নাকি গোল-বিতর্কের প্রতিবাদে প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে, তা দ্রুতই স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে আইএফএ এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং ক্লাবের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোনও সমাধান হয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে কলকাতা ফুটবলমহলের।


