ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব এবং হাউথিদের মধ্যে চলমান সংঘাতের আঁচ এবার আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের পাশে সামরিকভাবে দাঁড়ালে পাকিস্তান ও তুরস্ককেও পালটা জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে হাউথিরা। হাউথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য এবং ধামার প্রদেশের গভর্নর মহম্মদ আল-বুখাইতি এক ইরাকি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এই সতর্কবার্তা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তান বা তুরস্ক ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হলে হাউথিরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
হাউথিদের এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন সৌদি আরবকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। গত কয়েকদিনে সৌদি ভূখণ্ডে হাউথিদের হামলার খবর পাওয়া গিয়েছে। রবিবার রিয়াধের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে হাউথিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকেও রিয়াধের দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানানো হয়েছে। পরিস্থিতির জেরে সৌদি আরবের একাধিক এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ গত ৭ অগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির মূল নীতিগুলির মধ্যে রয়েছে তিন দেশের মধ্যে সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের কোনও একটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে সৌদি আরবের উপর চলমান হামলার প্রেক্ষিতে চুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হাউথি নেতা আল-বুখাইতির বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে, তাঁদের আপত্তি মূলত পাকিস্তান এবং তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে। তাঁর দাবি, ইয়েমেনে বিদেশি শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ তাঁরা মেনে নেবেন না। পাকিস্তান বা তুরস্ক সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি পাকিস্তান ও তুরস্কের সাধারণ মানুষের ইয়েমেনের প্রতি সহানুভূতির কথা উল্লেখ করলেও সতর্কবার্তাটি দুই দেশের সরকারের উদ্দেশেই বলে জানিয়েছেন।
তবে পাকিস্তানের অবস্থান এখনও সরাসরি ইয়েমেনে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তের দিকে যায়নি। এর আগে পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে হাউথিদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে তখন কোনও আলোচনা চলছিল না। পাকিস্তান অবশ্য সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হাউথিদের হামলার নিন্দা করেছে এবং সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অন্যদিকে তুরস্কের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। তুরস্কের বিদেশমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, হাউথিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের সামরিক ক্ষেত্রে প্রয়োজন তৈরি হলে তুরস্ক সেই প্রয়োজন মেটাতে প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিন দেশের মধ্যে হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে আঙ্কারা রিয়াধের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে। বিশেষ করে কিছু প্রযুক্তিগত বা সামরিক ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সহায়তার প্রয়োজন হলে তুরস্ক তা বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এই অবস্থানই হাউথিদের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তুরস্ক যদি সৌদি আরবকে সামরিক বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয় এবং পাকিস্তানও কোনও পর্যায়ে প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সক্রিয় হয়, তাহলে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমানে দুই দেশ কী ধরনের নির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে কোনও পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা প্রকাশ্যে আসেনি।
ইয়েমেনের সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালে হাউথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই দেশটিতে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা চলছে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংঘাতের পর সাম্প্রতিক মাসগুলিতে আবারও সৌদি আরব ও হাউথিদের মধ্যে সংঘর্ষের মাত্রা বেড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের পাশাপাশি গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রিয়াধের পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল পরিকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথকে ঘিরেও নিরাপত্তা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। হাউথিরা লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালীর মতো কৌশলগত অঞ্চলে সক্রিয় থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতিটি আরও জটিল। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত হাউথিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্ন রয়েছে। পাকিস্তান এখনও সৌদি আরবের প্রতি সমর্থনের কথা বললেও, মক্কা চুক্তির অধীনে ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট ঘোষণা করেনি।
তুরস্কের ক্ষেত্রেও একই চুক্তি নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। আঙ্কারা সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রশ্নে সংহতি প্রকাশ করেছে এবং প্রয়োজন হলে সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। ফলে হাউথিদের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি শুধু ইয়েমেনের সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সম্পর্কের উপরও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইয়েমেনের সংঘাতকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া এই উত্তেজনায় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাউথিরা সরাসরি পাকিস্তান ও তুরস্ককে সতর্ক করেছে, অন্যদিকে তুরস্ক সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় সহায়তার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে এবং পাকিস্তান সৌদি সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে। এখন নজর থাকবে, পরিস্থিতি আরও সামরিক সংঘাতের দিকে এগোয় নাকি কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আসে।


