নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসের ছবি মন ছুঁয়ে গিয়েছিল উত্তরপ্রদেশের আট বছরের এক খুদের। টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমে বন্যার ভয়াবহতা দেখে মন খারাপ হয়ে যায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আলফাজ শেখের। বিপন্ন মানুষগুলির জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছা থেকেই শেষ পর্যন্ত নিজের এক বছরের সঞ্চয় তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। উত্তরপ্রদেশের বহরাইচে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দফতরে গিয়ে নিজের মাটির ভাঁড়ে জমানো টাকা তুলে দেয় ছোট্ট আলফাজ। তার এই মানবিক উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে বহু মানুষের।
নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, অনেকে নিখোঁজ এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যেই আলফাজের মতো একটি শিশুর নিজের জমানো অর্থ দান করার ঘটনা আলাদা করে মানুষের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে।
## এক বছর ধরে মাটির ভাঁড়ে টাকা জমাচ্ছিল
আলফাজের বয়স মাত্র আট বছর। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে সে। ছোট থেকেই নিজের ইচ্ছের জন্য টাকা জমিয়ে রাখার অভ্যাস ছিল তার। গত প্রায় এক বছর ধরে খুচরো পয়সা থেকে শুরু করে ছোট ছোট নোট নিজের মাটির ভাঁড়ে জমাচ্ছিল সে। সাধারণত এই বয়সে শিশুরা নিজেদের পছন্দের খেলনা, খাবার কিংবা কোনও প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য সঞ্চয় করে।
আলফাজও নিশ্চয়ই নিজের সেই সঞ্চয় নিয়ে অনেক পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু নেপালের বন্যার ছবি দেখার পর তার সেই পরিকল্পনা বদলে যায়। সংবাদমাধ্যমে বিপর্যস্ত মানুষের ছবি দেখে তার মনে হয়, নিজের জন্য টাকা খরচ করার চেয়ে এই মুহূর্তে বিপদে পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়ানো বেশি জরুরি।
এই ভাবনা থেকেই নিজের সঞ্চয়ের পুরো অর্থই ত্রাণের কাজে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে।
## জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে তুলে দিল সঞ্চয়
গত বৃহস্পতিবার আলফাজ নিজের মাটির ভাঁড় নিয়ে পৌঁছে যায় বহরাইচের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দফতরে। সেখানে গিয়ে নিজের জমানো অর্থ নেপালের বন্যার্তদের সাহায্যে ব্যবহার করার অনুরোধ জানায় সে।
এটি শুধুমাত্র অর্থদানের ঘটনা ছিল না। এত অল্প বয়সে একটি শিশু কীভাবে অন্য দেশের বিপন্ন মানুষদের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করেছে, সেই বিষয়টিই বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
আলফাজের বার্তা ছিল সহজ—যাঁরা বিপদের মধ্যে রয়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করার চেষ্টা করেছে সে।
## নেপালের ভয়াবহ পরিস্থিতির ছবি দেখেই বদলে যায় মন
নেপালে ২৬ অগস্ট থেকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়। হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট প্রবল বন্যা ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের কারণে ত্রিশুলি উপত্যকা-সহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। উদ্ধারকারী দলগুলি দুর্গম এলাকায় পৌঁছে আটকে থাকা মানুষদের খোঁজ চালাচ্ছে।
এই ভয়াবহতার ছবি সংবাদমাধ্যমে পৌঁছনোর পর ভারতের সাধারণ মানুষও নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ অর্থ সাহায্য করছেন, কেউ খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠাচ্ছেন। সেই বৃহত্তর মানবিক উদ্যোগের মধ্যেই আলফাজের ছোট্ট সঞ্চয় যেন আরও বড় বার্তা দিয়ে গেল।
## শিশুর সঞ্চয়েই বড় মানবিক বার্তা
আলফাজের ঘটনাটি শুধু একটি আবেগঘন গল্প নয়। এটি শিশুদের মধ্যেও যে সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি হতে পারে, তার একটি উদাহরণ। মাত্র আট বছর বয়সে সে বুঝতে পেরেছে যে নিজের আনন্দ কিছুটা পিছিয়ে রেখে অন্যের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানো যায়।
তার সঞ্চয়ের অঙ্ক হয়তো অনেক বড় নয়। কিন্তু সেই অর্থের মূল্য নির্ধারণ শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে করা সম্ভব নয়। কারণ এই অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি শিশুর নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত এবং বিপন্ন মানুষের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা।
সমাজে বড়রা যখন সাহায্যের বিভিন্ন পথ খুঁজছেন, তখন একটি শিশু নিজের সঞ্চয়ের ভাঁড় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তার এই উদ্যোগকে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
## আরও শিশুদের জন্য অনুপ্রেরণা
আলফাজের এই উদ্যোগ অন্য শিশুদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে। দুর্যোগের সময় সাহায্য করার অর্থ সবসময় বড় অঙ্কের অর্থদান নয়। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়া, সচেতনতা তৈরি করা কিংবা ত্রাণ সংগ্রহে সহযোগিতা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেপালের বন্যার্তদের জন্য শিশুদের এমন মানবিক উদ্যোগের খবর সামনে এসেছে। বিহারের সাহারসার ১২ বছরের বৈষ্ণবীও নিজের জন্মদিনের জন্য ছয় মাস ধরে জমানো টাকা নেপালের বন্যার্তদের সাহায্যে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ফলে আলফাজের মতো শিশুদের এই ছোট ছোট উদ্যোগ আসলে বিপর্যয়ের সময়ে মানবিকতার বড় ছবি তুলে ধরছে। দেশ, ভাষা কিংবা সীমান্তের পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে বিপদে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে মানসিকতা, সেটিই এমন ঘটনাকে বিশেষ করে তোলে।
নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয় কবে পুরোপুরি কাটবে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন—তার উত্তর এখনই নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ছোট্ট আলফাজ নিজের সঞ্চয়ের ভাঁড় খুলে যেন একটি কথা মনে করিয়ে দিয়েছে—**সাহায্যের জন্য বয়স নয়, প্রয়োজন শুধু একটি মানবিক মন।**


