নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর এখনও থামেনি উদ্ধার অভিযান। বিপর্যস্ত নেপালের বিভিন্ন এলাকায় আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় ও নেপালি উদ্ধারকারী দল। এর মধ্যেই আরও তিন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছে একটি পাঁচ বছরের শিশুও। এই তিনজনকে উদ্ধারের পর নেপাল থেকে নিরাপদে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৯। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া পরিবারটির ভারতে ফেরার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া তিনজন হলেন অভিজিৎ সুরেশ পাওয়ার, দীপিকা অভিজিৎ পাওয়ার এবং তাঁদের পাঁচ বছরের ছেলে সমর্থ অভিজিৎ পাওয়ার। নেপালের ভয়াবহ বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির মধ্যে থাকা ত্রিশূলী বাজার এলাকা থেকে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস তাঁদের বিমানে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করছে বলে জানিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক। একইসঙ্গে এখনও বহু ভারতীয় নাগরিকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, **২৭৫ জন ভারতীয় নাগরিক এখনও নিখোঁজ**। ফলে উদ্ধার অভিযান চললেও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
### উদ্ধার ভারতীয়ের সংখ্যা বেড়ে ১৬৯
নেপালে বিপর্যয়ের পর থেকেই ভারত সরকার নেপালি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালাচ্ছে। প্রথম দিকে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, ধ্বংসস্তূপ এবং কাদায় রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। বহু মানুষ বিভিন্ন জায়গায় আটকে পড়েন। এর মধ্যে ভারতীয় পর্যটক ও নাগরিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা ভারতীয় প্রশাসনের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।
বিদেশ মন্ত্রকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ১৬৯ জন ভারতীয়কে নেপাল থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে ২৭৫ জনের কোনও সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় দূতাবাস নেপাল সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কাজ করছে।
### তিব্বত থেকেও ফিরেছেন বহু ভারতীয়
নেপালের বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তিব্বতে আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা। বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, চিনের দিক থেকে **১,৯০৭ জন ভারতীয় নিরাপদে নেপালের দিকে চলে এসেছেন**। চিনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলে আর কোনও ভারতীয় পর্যটক আটকে নেই।
ফলে একদিকে নেপালের বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ভারতীয়দের উদ্ধার করা হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনার কাজও এগিয়েছে। এই দুই প্রক্রিয়াই পরিস্থিতির গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
### নেপালের পরিস্থিতি এখনও ভয়াবহ
২৬ অগস্টের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি নদীগুলিতে আচমকা জলস্তর বেড়ে গিয়ে বহু রাস্তা, সেতু এবং বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের কারণে বহু দুর্গম এলাকায় পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সরকারি আপডেট অনুযায়ী, নেপালে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ১,৩০০ ছাড়িয়েছে। ৫ হাজারের কাছাকাছি মানুষ এখনও নিখোঁজ বলে বিভিন্ন সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। ৫ সেপ্টেম্বর নেপাল পুলিশের হিসাবে মৃতের সংখ্যা **১,৩৪৪**-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখিত আগের মৃত্যুসংখ্যার তুলনায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
### জল-ধ্বংসস্তূপে আটকে উদ্ধারকাজ
নেপালের সবচেয়ে কঠিন উদ্ধার অভিযানগুলির একটি চলছে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গকে ঘিরে। ত্রিশূলী নদী সংলগ্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির একাধিক সুড়ঙ্গ বন্যার জল ও ধ্বংসাবশেষে আটকে রয়েছে। কোথাও জল পাম্প করে বের করা হচ্ছে, কোথাও আবার ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ার জন্য অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে।
চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ভারতীয় টানেল রেসকিউ বিশেষজ্ঞরা নেপাল সেনার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন। জল বের করার পাশাপাশি সুড়ঙ্গের ভিতরে আরও গভীরে পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজনীয় পথ তৈরির চেষ্টা চলছে। দড়ি, পাম্প এবং বিশেষ ধরনের ভাসমান সরঞ্জাম ব্যবহার করেও উদ্ধারকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
### ভারত পাঠিয়েছে বিশেষজ্ঞ দল
শুধু ভারতীয় নাগরিকদের উদ্ধার নয়, নেপালের সামগ্রিক উদ্ধার ও ত্রাণকাজেও সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারত এখনও পর্যন্ত প্রায় **৯৫ টন ত্রাণসামগ্রী** নেপালে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ত্রিপল, কম্বল, স্লিপিং ব্যাগ এবং জল পরিশোধনের ট্যাবলেট রয়েছে।
এর পাশাপাশি ভারত থেকে ৫৪ জন বিশেষজ্ঞকে নেপালে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৩০ জন টানেল রেসকিউ বিশেষজ্ঞ, ১৯ জন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং পাঁচ সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম। দুর্গম সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষদের খোঁজ এবং মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজেও এই দলগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
### মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করতেও সাহায্য
বিপর্যয়ের পর বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই কাজে ভারতীয় ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও নেপাল প্রশাসনকে সাহায্য করছেন। বিশেষ করে ডিএনএ এবং অন্যান্য ফরেনসিক পদ্ধতির মাধ্যমে মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী নেপালের প্রয়োজন মেটাতে ভারত আরও সাহায্য পাঠাতে প্রস্তুত। ভবিষ্যতে আরও ফরেনসিক কিট, বেইলি ব্রিজ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
### জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন
নেপালের এই ভয়াবহ বিপর্যয় নতুন করে জলবায়ু পরিবর্তন এবং হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। হিমবাহ, পাহাড়ি নদী এবং দ্রুত বদলে যাওয়া আবহাওয়ার পরিস্থিতির কারণে হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকেও জলবায়ু পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ভারতের বক্তব্য, উন্নত দেশগুলির ঐতিহাসিক নির্গমনের দায় রয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিকে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও উন্নত দেশগুলির বড় ভূমিকা থাকা উচিত।
সব মিলিয়ে, নেপালের ভয়াবহ বন্যায় এখনও প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন ভারতীয়কে নতুন করে উদ্ধার করে ১৬৯ জনকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কিন্তু ২৭৫ জন ভারতীয় এখনও নিখোঁজ থাকায় উদ্বেগ রয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে নেপালে মৃতের সংখ্যা ১,৩৪৪-এ পৌঁছনোয় বিপর্যয়ের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের খোঁজ, দুর্গম সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ একসঙ্গে চালাতে হচ্ছে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞ ও ত্রাণদলও সেই কাজে নেপাল প্রশাসনের পাশে রয়েছে।


