মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার মক্কা, জেদ্দা এবং তাইফে সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে সৌদি সিভিল ডিফেন্স। পবিত্র শহর মক্কায় এই ধরনের সতর্কতা জারি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, জাতীয় জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়। জানলা, বারান্দা, ছাদ এবং খোলা জায়গা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদিও সতর্কতা জারির সময় বিপদের নির্দিষ্ট কারণ বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি, তবে সাম্প্রতিক হুথি হামলার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
## মক্কায় প্রথমবার এমন সতর্কতা
সাম্প্রতিক সংঘাতের সময়ে মক্কায় এই প্রথম এমন জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থান মক্কা শরিফে সারা বছরই দেশ-বিদেশের বহু মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে এই শহরের নিরাপত্তা নিয়ে সামান্য আশঙ্কাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সৌদি সিভিল ডিফেন্স বাসিন্দাদের শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। সতর্কতা পাওয়ার পর নিকটবর্তী নিরাপদ ভবনে প্রবেশ করতে বলা হয়েছে। বাইরে থাকা ব্যক্তিদের শক্ত কোনও আশ্রয়ের আড়ালে যেতে বলা হয়। গাড়িচালকদের সেতু, উঁচু ভবন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে দূরে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর সতর্কতা প্রত্যাহার করা হলেও এই ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে হুথিদের হামলার পরিধি ইয়েমেন সীমান্তবর্তী এলাকা ছাড়িয়ে দেশের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের দিকে বাড়ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
## জেদ্দা ও তাইফেও সতর্কতা
মক্কার পাশাপাশি জেদ্দা এবং তাইফেও জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জেদ্দা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও বন্দরনগরী। অন্যদিকে, তাইফ সামরিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এই তিন শহরকে একসঙ্গে সতর্ক করার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
সতর্কবার্তায় বাসিন্দাদের জানলা ও বারান্দা থেকে দূরে থাকতে এবং অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোতে বলা হয়েছে। জমায়েত এড়িয়ে চলা এবং সরকারি নির্দেশ অনুসরণ করার কথাও জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, বিপদ কেটে না যাওয়া পর্যন্ত নিরাপদ জায়গায় থাকা জরুরি।
যদিও সতর্কতার পরে কোনও বড় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর নিশ্চিত করা হয়নি, তবুও এই ঘটনা সৌদি আরবের আকাশসীমা ও নাগরিক পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
## সৌদির পশ্চিম উপকূলে হুথিদের হামলা
গত কয়েকদিন ধরে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও সামরিক পরিকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইয়েমেনে যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তার জবাবেই এই পাল্টা আক্রমণ করা হচ্ছে।
হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তাঁদের বাহিনী সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্রভাণ্ডার, কমান্ড সেন্টার এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। তবে হুথিদের দাবি করা হামলার সবকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান এবং নাজরান এলাকায় হামলায় বহু সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। কয়েকটি ঘটনায় বাড়িঘর, যানবাহন এবং ধর্মীয় স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।
## সামরিক ঘাঁটি ও তেল পরিকাঠামোও নিশানায়
হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামোও। আবহা, জিজান এবং নাজরান এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কেন্দ্রকে লক্ষ্য করার দাবি করেছে হুথি গোষ্ঠী।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক দেশ। ফলে তেল পরিকাঠামোতে হামলা হলে তার প্রভাব শুধু সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক পরিবহণের উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এবং বাব-এল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশে হুথিদের সামরিক সক্রিয়তা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
## সৌদি আরবের পাল্টা আক্রমণ
হুথিদের হামলার জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইয়েমেনের একাধিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। হুথিদের দাবি, গত কয়েকদিনে মারিব, আল-বায়দা, আল-হুদাইদা, তাইজ এবং আল-জাওফ প্রদেশে একাধিক হামলা হয়েছে।
সৌদি আরবের বক্তব্য, দেশের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ রক্ষা করতেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, হুথিরা দাবি করছে, সৌদি হামলার জবাব হিসেবেই তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযান চালাচ্ছে।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে এগোচ্ছে। ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী এবং হুথিদের মধ্যে লড়াই বাড়ার পাশাপাশি সংঘাতের প্রভাব সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও পড়ছে।
## পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে আলোচনা
হুথিদের হামলার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এর আগে সতর্ক করেছিলেন, সৌদি আরবের উপর হামলা বাড়লে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির ধারা কার্যকর হতে পারে।
এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হল, কোনও একটি দেশের উপর বহিরাগত হামলা হলে অন্য অংশীদার দেশগুলি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করবে। মক্কার মতো পবিত্র স্থান এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর নিরাপত্তা এই সহযোগিতার অন্যতম বিষয়।
তবে কূটনৈতিক মহলের মতে, সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক পথ খুঁজতে চাইবে। কারণ, সৌদি আরবের উপর হামলা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
## রাষ্ট্রসংঘের উদ্বেগ
ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রসংঘও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করেছেন, সৌদি আরবের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা সংঘাতকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারে এবং রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে দুর্বল করবে।
ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের ফলে ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খাদ্য, চিকিৎসা এবং নিরাপত্তার অভাবে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। নতুন করে সংঘাত বাড়লে মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের হামলা এবং সৌদি পাল্টা আক্রমণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইয়েমেনের পাশাপাশি সৌদি আরব, লোহিত সাগর এবং গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, তেল সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
## সামনে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা
মক্কায় সতর্কতা জারি হওয়া সাম্প্রতিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত পবিত্র শহরে বড় কোনও হামলার নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু সম্ভাব্য বিপদের সতর্কতা জারি হওয়াই দেখিয়ে দিচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
হুথিরা সৌদি আরবের গভীরে হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীও ইয়েমেনে সামরিক অভিযান জোরদার করছে। এর ফলে দুই পক্ষের সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, মক্কা, জেদ্দা ও তাইফে জরুরি সতর্কতা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার নতুন দিক তুলে ধরেছে। পবিত্র শহরগুলির নিরাপত্তা, সৌদি আরবের তেল পরিকাঠামো এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ—সবকিছু এখন একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে। আন্তর্জাতিক মহল তাই দ্রুত সংঘাত কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছে।


