কর্নাটকের বেলগাভিতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বাড়ির ভিতরে থাকা ফ্রিজে বিস্ফোরণের জেরে আগুন লেগে মৃত্যু হল একই পরিবারের চার মহিলার। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দু’জন। সোমবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিস্ফোরণের সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে ফরেনসিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার কারণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
## গভীর রাতে আচমকাই বিকট শব্দ
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার রাত প্রায় আড়াইটে নাগাদ বেলগাভির চাবাত গলি এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। এলাকাটি সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি। ওই বাড়িতে গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে পরিবারের সদস্যরা পুজোর আয়োজন করেছিলেন। রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। প্রত্যেকের মতো সেদিনও তাঁরা ফ্রিজের কাছাকাছি একটি ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন।
রাত প্রায় ২টা ১৫ মিনিট নাগাদ আচমকাই ফ্রিজে বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানা গিয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের বাসিন্দাদের ঘুম ভেঙে যায়। তাঁরা ছুটে এসে দেখতে পান, বাড়ির একটি অংশে আগুন জ্বলছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ঘরে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ভিতরে থাকা চার মহিলাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
## মৃত চার মহিলার পরিচয়
এই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় চারজনের। মৃতদের নাম গঙ্গা দামোনে, শারদা দামোনে, ভারতী দামোনে এবং প্রিয়া দামোনে। অন্য একটি প্রতিবেদনে তাঁদের বয়সও উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীর বয়স ৫০ বছর, শারদার ৪৫, গঙ্গার ২৫ এবং প্রিয়ার ২৪ বছর।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত শারদা দামোনে ছিলেন গজানন দামোনের স্ত্রী। ভারতী ছিলেন গজাননের বোন। গঙ্গা ও প্রিয়া ছিলেন গজানন এবং শারদার দুই মেয়ে। অর্থাৎ, এই বিস্ফোরণে একই পরিবারের চার মহিলা প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, একটি পরিবারের উপর নেমে আসা ভয়াবহ বিপর্যয় বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
## গুরুতর আহত আরও দুইজন
বিস্ফোরণের পর আগুনে গুরুতরভাবে ঝলসে যান পরিবারের আরও দুই সদস্য—গজানন দামোনে এবং রোশন দামোনে। স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের আগুনের মধ্য থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। বর্তমানে তাঁরা চিকিৎসাধীন।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আহত দু’জনের শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে। তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে। দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হলেও, বিস্ফোরণের তীব্রতা এবং আগুনের কারণে তাঁদের শরীরে গুরুতর আঘাত লাগে। চিকিৎসকেরা তাঁদের পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।
## আগুনে ভস্মীভূত বাড়ির একাংশ
বিস্ফোরণের জেরে শুধু প্রাণহানি নয়, বাড়িরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জানা গিয়েছে, পরিবারের সদস্যরা যে ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন, সেটি ছিল একটি শেডের মতো কাঠামো। সেখানে পাকা কংক্রিটের দেওয়াল ছিল না। বিস্ফোরণের অভিঘাতে ঘরের কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং আগুনে বাড়ির অধিকাংশ জিনিসপত্র পুড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় আহত দু’জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, বাকি চারজনকে আগুনের কবল থেকে বের করে আনা যায়নি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকলকেও খবর দেওয়া হয়। পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ গোটা এলাকা ঘিরে তদন্ত শুরু করে। বিস্ফোরণের অভিঘাত কতটা ভয়াবহ ছিল, ঘরের ক্ষয়ক্ষতির ছবি থেকেই তা স্পষ্ট বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
## শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনা, তদন্তে পুলিশ
বেলগাভির পুলিশ কমিশনার প্রকাশ নিকাম জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিটের কারণে এই বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
পরিবারের জীবিত সদস্য রোশন জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের ঠিক আগে তিনি শর্ট সার্কিটের মতো একটি শব্দ শুনেছিলেন। সেই সূত্র ধরেই বিদ্যুৎ সংযোগ বা ফ্রিজের বৈদ্যুতিক ত্রুটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র শব্দ শোনার ভিত্তিতে বিস্ফোরণের কারণ নির্ধারণ করা হচ্ছে না। ফ্রিজের যান্ত্রিক ত্রুটি, বৈদ্যুতিক সংযোগ, কম্প্রেসর বা অন্য কোনও কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
ঘটনাস্থলে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং দমকল আধিকারিকরা পৌঁছে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। বিস্ফোরণের আগে ফ্রিজের অবস্থান, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ঘরের অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর মৃতদেহগুলি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
## গৃহস্থালির বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিয়ে সতর্কতা
এই দুর্ঘটনা ফের গৃহস্থালির বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফ্রিজ সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে চালু থাকে। ফলে পুরনো তার, ত্রুটিপূর্ণ প্লাগ, অতিরিক্ত ভোল্টেজ, শর্ট সার্কিট বা যন্ত্রাংশের সমস্যার কারণে বিপদ তৈরি হতে পারে। যদিও এই ঘটনায় ঠিক কী কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা এখনও তদন্তাধীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রিজ থেকে অস্বাভাবিক শব্দ, পোড়া গন্ধ, অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া বা বারবার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দক্ষ মেকানিক বা অনুমোদিত পরিষেবা সংস্থার সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে ফ্রিজের পিছনে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা এবং ত্রুটিপূর্ণ তার বা মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে বেলগাভির এই ঘটনায় কোনও নির্দিষ্ট ত্রুটি আগে থেকে ছিল কি না, তা এখনও জানা যায়নি। পুলিশি তদন্ত এবং ফরেনসিক রিপোর্ট সামনে এলেই বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে।
## শোকের ছায়া এলাকায়
গণেশ চতুর্থীর আয়োজনের মধ্যেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে বেলগাভির চাবাত গলি এলাকায়। একই পরিবারের চার মহিলার মৃত্যুতে আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীরা ভেঙে পড়েছেন। আহত দুই সদস্যের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্ঘটনার পিছনে বৈদ্যুতিক গোলযোগ, ফ্রিজের প্রযুক্তিগত ত্রুটি নাকি অন্য কোনও কারণ রয়েছে, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত করা যাবে। আপাতত মৃতদের পরিচয় নথিভুক্ত করে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার উপর নজর রাখা হচ্ছে।


