মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবার আরও বড় আন্তর্জাতিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল মন্দাব প্রণালী ঘিরে আশঙ্কা বাড়ছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ যেকোনও সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, তেল সরবরাহ এবং এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যে বড়সড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলবর্তী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোখা বন্দর এবং বাব আল মন্দাবের কাছে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপ। এই দখলের ফলে প্রণালীর উপর হুথিদের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব অনেকটাই বেড়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করার বিষয়ে হুথিদের অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়, তবুও পরিস্থিতি যে অত্যন্ত উদ্বেগজনক, তা মানছেন বিশেষজ্ঞরা।
## কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল মন্দাব?
বাব আল মন্দাব প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহণের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ এই জলপথের মধ্য দিয়েই গিয়েছে। লোহিত সাগর পেরিয়ে জাহাজগুলি সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছয়। ফলে বাব আল মন্দাব বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজগুলিকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অফ গুড হোপ হয়ে যেতে হবে।
এই বিকল্প পথ অনেক দীর্ঘ। এতে জাহাজের যাত্রার সময় বাড়বে, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহণ ব্যয়ও অনেকটা বেড়ে যাবে। শুধু পণ্যবাহী জাহাজ নয়, বিশ্বের তেল সরবরাহের ক্ষেত্রেও এই প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম পরিবহণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই রুটের উপর নির্ভরশীল। ফলে বাব আল মন্দাবের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
## মোখা বন্দর ও মায়ুন দ্বীপ দখল
সাম্প্রতিক সময়ে হুথি বাহিনী ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর দখল করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাব আল মন্দাব প্রণালীর কাছে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপও হুথিদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
মায়ুন দ্বীপের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বীপ থেকে প্রণালীর মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলির উপর নজরদারি চালানো এবং প্রয়োজনে হামলার হুমকি তৈরি করা সম্ভব। ফলে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ সংস্থাগুলির উদ্বেগ বেড়েছে।
হুথিরা অবশ্য দাবি করেছে, তাদের সামরিক অভিযান নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বজায় রাখার কথাও তারা জানিয়েছে। তবে সৌদি আরবের জাহাজের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান আলাদা। এই দ্বৈত অবস্থানের কারণে জাহাজ চলাচলকারী সংস্থাগুলি আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে।
## সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
বাব আল মন্দাবের উপর চাপ বাড়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারে সৌদি আরব। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালীতে ইতিমধ্যেই জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দর ও রুট ব্যবহার করে তেল রপ্তানির বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।
কিন্তু বাব আল মন্দাবও যদি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেই বিকল্প পথও কার্যত অচল হয়ে পড়বে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সৌদি আরব ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। লোহিত সাগর উপকূলবর্তী বন্দর থেকে তেল পরিবহণও নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্যাহত হতে পারে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উপরও তার প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ বাব আল মন্দাবের সংকট শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
## জাহাজ চলাচলে বাড়ছে ঝুঁকি
লোহিত সাগরে হুথিদের হামলার আশঙ্কা নতুন নয়। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকেই এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে। এর জেরে বহু আন্তর্জাতিক জাহাজ সংস্থা লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে চলতে শুরু করে। ফলে জাহাজগুলিকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হয়।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই ঝুঁকি আরও বেড়েছে। হুথিদের উপকূলীয় অগ্রগতি এবং গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখলের ফলে জাহাজ চলাচলের উপর তাদের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরাপত্তার কারণে বীমা খরচ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের যাত্রার সময়ও দীর্ঘ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ না হলেও যদি জাহাজগুলি নিরাপত্তার কারণে এই রুট ব্যবহার বন্ধ করে দেয়, তাহলেও কার্যত একই ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। কারণ বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির কাছে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহণপথ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
## ভারতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে প্রভাব
বাব আল মন্দাব প্রণালী ঘিরে সংকট ভারতের জন্যও উদ্বেগের কারণ। ভারত ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহণের একটি বড় অংশ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে যায়। এই রুটে সমস্যা হলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের পণ্য পৌঁছতে বেশি সময় লাগবে। পরিবহণ খরচ বেড়ে গেলে পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, রাসায়নিক দ্রব্য, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য এবং অন্যান্য শিল্পসামগ্রীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিবহণ ব্যয় তৈরি হতে পারে। আমদানির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। কাঁচামাল বা প্রয়োজনীয় পণ্য দেরিতে পৌঁছলে উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ পড়বে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক তেলের দাম বেড়ে গেলে ভারতের আমদানি খরচও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি বাজার, পরিবহণ খরচ এবং মুদ্রাস্ফীতির উপর। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট ভারতের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
## সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
বাব আল মন্দাব ঘিরে উত্তেজনা শুধু বাণিজ্যিক সমস্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংঘাত। হুথিরা ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে ইয়েমেনে ফের বড় আকারের গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। সংঘাত বাড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরব সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে। আমেরিকার কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া হলেও সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
## এখনই কি বন্ধ হচ্ছে বাব আল মন্দাব?
এই মুহূর্তে বাব আল মন্দাব প্রণালী সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করা যাচ্ছে না। তবে হুথিদের সাম্প্রতিক দখল এবং সামরিক অগ্রগতির ফলে প্রণালী বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হুথিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপ চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা লোহিত সাগরে নিরাপদ নৌচলাচল বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু সংঘাত দ্রুত না কমলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। বাব আল মন্দাব যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্য, তেল সরবরাহ এবং পরিবহণ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, হুথিদের অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বাব আল মন্দাব নিয়েও যদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির উপর তার প্রভাব অত্যন্ত গভীর হতে পারে। এখন নজর, হুথিরা পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।


