সিকিমে ফের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ ছবি। প্রবল বৃষ্টি, পাহাড়ি ধস এবং হড়পা বানের জেরে বিপর্যস্ত উত্তর সিকিমের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভয়াবহ ভূমিধসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ভেসে গিয়েছে। একইসঙ্গে ফ্ল্যাশ ফ্লাডের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একটি আইসিডিএস কেন্দ্রও। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিশুদের পুষ্টি ও প্রাথমিক শিক্ষার পরিষেবা—সবকিছু নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
## প্রবল বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত পাহাড়ি এলাকা
সিকিমে বর্ষার সময় ভারী বৃষ্টি নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি নদী ও ঝোরা ফুলেফেঁপে ওঠে। তার জেরেই একাধিক জায়গায় ধস নামে এবং রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও পাহাড়ের মাটি নেমে এসে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, আবার কোথাও নদীর জলের তোড়ে সেতু ভেসে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভয়াবহ ধসের জেরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয় মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পাহাড়ি এলাকায় একটি সেতু শুধু যান চলাচলের মাধ্যম নয়, বহু গ্রামের সঙ্গে মূল জনপদের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। ফলে সেতু ভেঙে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দৈনন্দিন জীবন, স্কুল, বাজার, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জরুরি উদ্ধারকাজেও।
এর আগে সিকিমের মাঙ্গান জেলার ফিডাং ও সাঙ্কালাংয়ের মধ্যে সংযোগকারী একটি বেইলি ব্রিজ প্রবল বৃষ্টির জেরে ফুলে ওঠা পাহাড়ি স্রোতে ভেসে গিয়েছিল। সেই ঘটনায় ডজংগু এলাকার একাধিক গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সিকিমের পাহাড়ি অঞ্চলে অতিবৃষ্টির সময় এই ধরনের সেতু বিপর্যয় যে কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, সেই ঘটনার পর ফের তা স্পষ্ট হল।
## সেতু ভেঙে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা
পাহাড়ি এলাকায় সেতু ভেঙে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি নির্মাণ ভেঙে পড়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু মানুষের জীবনযাত্রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেককেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে অথবা প্রশাসনিক কাজে দূরের এলাকায় যেতে হয়। সেতু ভেসে গেলে তাঁদের বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়। অনেক সময় সেই বিকল্প পথও ধস বা জলের তোড়ে বন্ধ হয়ে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন বয়স্ক মানুষ, শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা। জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুল্যান্স বা উদ্ধারকারী দলও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে না। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
সিকিমে এর আগেও ভারী বৃষ্টির কারণে একাধিক রাস্তা, কালভার্ট এবং বেইলি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি নদীর জলস্তর আচমকা বেড়ে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাস্তা ও সেতুর মতো পরিকাঠামো ভেসে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন করে পরিকাঠামো নির্মাণের সময় নদীর গতিপথ, মাটির স্থায়িত্ব এবং অতিবৃষ্টির সম্ভাবনাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
## ফ্ল্যাশ ফ্লাডে ক্ষতিগ্রস্ত আইসিডিএস কেন্দ্র
সেতু বিপর্যয়ের পাশাপাশি ফ্ল্যাশ ফ্লাডের জেরে একটি আইসিডিএস কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ওই কেন্দ্রের মাধ্যমে স্থানীয় শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং প্রসূতিদের জন্য পুষ্টি, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং প্রাথমিক পরিষেবা দেওয়া হয়ে থাকে। ফলে কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকার শিশু ও মায়েদের পরিষেবা পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইসিডিএস বা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি প্রত্যন্ত এলাকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক পরিবারে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, টিকাকরণ সংক্রান্ত তথ্য, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এই কেন্দ্রগুলির উপর নির্ভর করতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ফ্ল্যাশ ফ্লাডের জলে কেন্দ্রের ঘর, আসবাবপত্র, নথিপত্র এবং শিশুদের জন্য রাখা সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত বিকল্প জায়গায় পরিষেবা চালু করা সম্ভব হবে কি না, সেই বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দুর্যোগের সময়ে শিশু ও প্রসূতিদের জন্য পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ যাতে বন্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
## উদ্ধার ও ত্রাণকাজে প্রশাসনের নজর
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সাধারণত স্থানীয় প্রশাসন, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, পুলিশ এবং দমকল একসঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করা, আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়।
সিকিমের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন। ধস নামার আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকারী দলকে সাবধানে এগোতে হয়। কোথাও রাস্তার উপর মাটি ও পাথর জমে থাকলে যন্ত্রপাতি নিয়ে পৌঁছনোও কঠিন হয়ে পড়ে। আবার নদীর জলস্তর বেশি থাকলে ভেঙে যাওয়া সেতু বা কালভার্টের কাছে যাওয়া বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর জায়গায় অস্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করা, বিকল্প রাস্তা চিহ্নিত করা এবং স্থানীয়দের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত আইসিডিএস কেন্দ্রের পরিষেবা দ্রুত স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
## পাহাড়ি দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে
সিকিম-সহ গোটা হিমালয় অঞ্চল গত কয়েক বছরে বারবার অতিবৃষ্টি, ধস, হড়পা বান এবং হিমবাহ-সংক্রান্ত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে। কখনও দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হচ্ছে না, আবার কখনও অল্প সময়ে অত্যন্ত বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ি নদী ও ঝোরায় আচমকা জল বেড়ে গিয়ে ফ্ল্যাশ ফ্লাড তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। নদীর জলস্তর পর্যবেক্ষণ, ধসপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত সতর্ক করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিকাঠামোর নিয়মিত পরিদর্শন জরুরি। সেতু ও রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও বেশি বৃষ্টি হতে পারে—এই সম্ভাবনা মাথায় রাখতে হবে।
সিকিম সরকার ইতিমধ্যেই হিমবাহ-উৎসারিত বন্যা বা গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাডের ঝুঁকি কমাতে কেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছে। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং হ্রদ পর্যবেক্ষণের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
## স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক
সেতু ভেঙে যাওয়া এবং আইসিডিএস কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আরও বৃষ্টি হলে নতুন করে ধস নামতে পারে বা নদীর জলস্তর বাড়তে পারে—এই আশঙ্কায় অনেকেই উদ্বিগ্ন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা, দ্রুত ত্রাণ সরবরাহ এবং শিশু ও মহিলাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা চালু রাখা। ক্ষতিগ্রস্ত সেতু পুনর্নির্মাণে সময় লাগতে পারে। তাই তার আগে অস্থায়ী সেতু বা বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা করা না হলে স্থানীয় মানুষের সমস্যা আরও বাড়বে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানির নির্দিষ্ট তথ্য সামনে আসেনি। তবে পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে, তা স্পষ্ট। আবহাওয়া পরিস্থিতির উপর নজর রেখে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয়রা।


