আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজে পরপর দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ নিজেদের দখলে নিল ভারত। দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় টি-২০ ম্যাচে আফগানিস্তানকে ৭ উইকেটে হারিয়ে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ জয় নিশ্চিত করল টিম ইন্ডিয়া। ব্যাট হাতে সঞ্জু স্যামসনের দুরন্ত অর্ধশতরান এবং বল হাতে নীতীশ কুমার রেড্ডির কার্যকর স্পেল ভারতের জয়ের ভিত গড়ে দেয়।
টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভারত। শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে আফগানিস্তানের ব্যাটিংকে চাপে রাখে ভারতীয় দল। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৫৯ রান তোলে আফগানিস্তান। ফলে ভারতের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৬০ রান।
জবাবে মাত্র ১৪.৫ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে সেই রান তুলে নেয় ভারত। আফগানিস্তানের বোলাররা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট পেলেও ভারতের ব্যাটিং গভীরতার সামনে শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারেনি।
## সঞ্জু স্যামসনের দুরন্ত প্রত্যাবর্তন
ভারতের জয়ের অন্যতম প্রধান নায়ক সঞ্জু স্যামসন। প্রথম ম্যাচে বড় রান করতে না পারার পর দ্বিতীয় টি-২০-তে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে সমালোচকদের জবাব দিলেন তিনি। মাত্র ৩৭ বলে ৫৭ রান করে ভারতকে জয়ের পথে এগিয়ে দেন সঞ্জু।
তাঁর ইনিংসে ছিল সাতটি চার এবং চারটি ছক্কা। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাট করেন তিনি। আফগানিস্তানের পেসারদের বিরুদ্ধে কভার ড্রাইভ, পুল এবং কাট শটে রান তুলতে থাকেন। স্পিনারদের বিরুদ্ধেও ক্রিজ ব্যবহার করে দ্রুত রান সংগ্রহ করেন ভারতীয় উইকেটকিপার-ব্যাটার।
সঞ্জুর ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস। প্রথম ম্যাচে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারলেও দ্বিতীয় ম্যাচে পরিস্থিতি বুঝে ইনিংস সাজান তিনি। শুরুতে আগ্রাসী ব্যাটিং করলেও পরে প্রয়োজন অনুযায়ী স্ট্রাইক রোটেট করেন। শেষ পর্যন্ত অর্ধশতরান পূর্ণ করে ভারতকে শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দেন।
সঞ্জুর এই ইনিংস শুধু ম্যাচ জেতানোর ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং ভারতীয় দলের ব্যাটিং কম্বিনেশন নিয়েও নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করবে। ওপেনিংয়ে তাঁর সঙ্গে অভিষেক শর্মার জুটি আফগানিস্তানের বোলিং আক্রমণকে শুরু থেকেই চাপে ফেলে দেয়।
## অভিষেকের ঝোড়ো শুরু
ভারতের রান তাড়ার শুরুটা ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। ওপেনার অভিষেক শর্মা মাত্র ১৯ বলে ৩৯ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল দ্রুতগতির বাউন্ডারি ও ছক্কার ঝড়। পাওয়ারপ্লে-তেই ভারতীয় দল বড় রান তুলে আফগানিস্তানের উপর চাপ তৈরি করে।
অভিষেক ও সঞ্জু প্রথম উইকেটে ৮৮ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। এই জুটির ফলে ভারতের রান তাড়ার কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। আফগানিস্তানের বোলাররা লাইন-লেংথ ঠিক রাখতে পারেননি। শর্ট বল এবং অফ স্টাম্পের বাইরে বল করে ভারতীয় ব্যাটারদের আটকানোর চেষ্টা করলেও তাতে বিশেষ লাভ হয়নি।
অভিষেকের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ফলে ভারত পাওয়ারপ্লে-তেই বড় রান সংগ্রহ করে। তিনি আউট হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় রানরেট অনেকটাই কমিয়ে দেন। ফলে পরের ব্যাটারদের উপর চাপ তৈরি হয়নি।
## ইশান ও তিলকের দায়িত্বশীল ব্যাটিং
অভিষেক এবং সঞ্জুর বিদায়ের পরও ভারতের রান তাড়ায় কোনও সমস্যা হয়নি। ইশান কিশান ও তিলক বর্মা দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে দলকে জয়ের দিকে নিয়ে যান।
ইশান কিশান ৩৮ রান করে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল আক্রমণ ও নিয়ন্ত্রণের সুন্দর মিশেল। প্রয়োজন অনুযায়ী বাউন্ডারি মারার পাশাপাশি সিঙ্গলস ও ডাবলস নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখেন তিনি।
অন্যদিকে তিলক বর্মাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মাঝের ওভারে আফগানিস্তানের স্পিনাররা কিছুটা চাপ তৈরি করার চেষ্টা করলেও তিলক ঠান্ডা মাথায় খেলেন। তাঁর ব্যাটিং ভারতের জয় নিশ্চিত করে।
ভারতের ব্যাটিং লাইনআপে একাধিক ম্যাচউইনার থাকায় আফগানিস্তানের পক্ষে ম্যাচে ফেরার সুযোগ খুব কম ছিল। একজন ব্যাটার আউট হলেও পরের ব্যাটার দ্রুত রান তুলে চাপ সামলে নেন। এই ব্যাটিং গভীরতাই দ্বিতীয় টি-২০-তে ভারতের বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
## বল হাতে নীতীশ কুমার রেড্ডির সাফল্য
ভারতের বোলিং বিভাগেও নজর কাড়েন নীতীশ কুমার রেড্ডি। তিনি ২৪ রান দিয়ে ৩টি উইকেট তুলে নেন। আফগানিস্তানের মিডল অর্ডারে ধস নামানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আফগানিস্তান শুরুতে কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলেও মাঝের ওভারগুলিতে পরপর উইকেট হারায়। নীতীশের বোলিং সেই ধসকে আরও তীব্র করে। তিনি ব্যাটারদের ভুল শট খেলতে বাধ্য করেন এবং রান করার গতি কমিয়ে দেন।
ভারতের হয়ে অর্শদীপ সিংও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ২টি উইকেট তুলে নেন। জসপ্রীত বুমরাহ, অক্ষর পটেল এবং রবি বিষ্ণোই একটি করে উইকেট পান। ভারতীয় বোলারদের সম্মিলিত পারফরম্যান্সের ফলে আফগানিস্তান ১৬০ রানের বেশি তুলতে পারেনি।
বিশেষ করে পাওয়ারপ্লে এবং মিডল ওভারে ভারতের বোলিং ছিল নিয়ন্ত্রিত। আফগানিস্তানের ব্যাটাররা বড় পার্টনারশিপ গড়তে পারেননি। শেষদিকে মহম্মদ নবী ও রশিদ খান কিছুটা রান যোগ করলেও তা জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
## আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ে ইব্রাহিম ও রশিদের লড়াই
আফগানিস্তানের হয়ে ইব্রাহিম জাদরান সর্বোচ্চ ৩৭ রান করেন। ইনিংসের শুরুতে তিনি দলের স্কোর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সামনে বড় ইনিংস গড়তে পারেননি।
দারভিশ রাসুলি ২৬ রান করেন। তবে আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব দেখা যায়। একদিকে কয়েকজন ব্যাটার শুরু পেলেও কেউ বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ফলে নির্ধারিত ২০ ওভারে দলের স্কোর ১৫৯ রানে থেমে যায়।
শেষদিকে মহম্মদ নবী ২০ রান এবং রশিদ খান ২৮ রান করে কিছুটা লড়াই করেন। তাঁদের জুটির কারণে আফগানিস্তান ১৫০ রানের গণ্ডি পার করে। কিন্তু ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের বিরুদ্ধে এই রান যথেষ্ট ছিল না।
রশিদ খান বল হাতেও ভারতের তিনটি উইকেট তুলে নেন। তাঁর শিকার হন সঞ্জু স্যামসনসহ ভারতের তিন ব্যাটার। তবে অন্য প্রান্ত থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় তাঁর বোলিং ভারতের রান তাড়া আটকাতে পারেনি।
## সিরিজ জয়ে ভারতের আত্মবিশ্বাস বাড়ল
প্রথম ম্যাচেও ভারত ৭ উইকেটে জয় পেয়েছিল। সেই ম্যাচে অভিষেক শর্মা মাত্র ৩২ বলে ৮২ রান করে ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন। দ্বিতীয় ম্যাচে সঞ্জু স্যামসনের অর্ধশতরান এবং নীতীশ রেড্ডির বোলিংয়ের উপর ভর করে ভারত আবারও একই ব্যবধানে জয় পেল।
দুই ম্যাচেই ভারতের জয় এসেছে তুলনামূলকভাবে সহজে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দলটি ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই ভালো ছন্দে রয়েছে। নতুন ও তরুণ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাও নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন।
এই সিরিজে ভারতের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল, একাধিক ক্রিকেটার ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা দেখাচ্ছেন। কখনও অভিষেক, কখনও সঞ্জু, আবার কখনও বোলিং বিভাগ সামনে থেকে দায়িত্ব নিচ্ছে। ফলে কোনও একজন ক্রিকেটারের উপর দলের নির্ভরতা কমছে।
## শেষ ম্যাচে নজর থাকবে নতুনদের উপর
তিন ম্যাচের সিরিজ ইতিমধ্যেই জিতে গেলেও শেষ টি-২০ ম্যাচটি ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে জয় পাওয়ার লক্ষ্য থাকবে ভারতীয় দলের। পাশাপাশি শেষ ম্যাচে বেঞ্চে থাকা ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে।
তরুণ ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য শেষ ম্যাচে দল কিছু পরিবর্তন করতে পারে। তবে অধিনায়ক ও কোচিং স্টাফের পরিকল্পনার উপরই তা নির্ভর করবে।
অন্যদিকে, আফগানিস্তান শেষ ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। রশিদ খান, মহম্মদ নবী এবং ইব্রাহিম জাদরানদের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের কাছ থেকে বড় পারফরম্যান্স আশা করবে দলটি। সিরিজে হোয়াইটওয়াশ এড়ানোই হবে আফগানিস্তানের প্রধান লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় টি-২০-তে ভারতের ৭ উইকেটের জয় শুধু সিরিজ জয়ের পথ পরিষ্কার করেনি, বরং দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে। সঞ্জু স্যামসনের প্রত্যাবর্তন, অভিষেকের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এবং নীতীশ রেড্ডির কার্যকর বোলিং ভারতীয় দলের শক্তি আরও একবার প্রমাণ করল।


