অরুণাচল প্রদেশে লাগাতার ভারী বৃষ্টির জেরে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। একদিকে একের পর এক এলাকায় ভূমিধস, অন্যদিকে হড়পা বান ও বন্যার জেরে বিপর্যস্ত জনজীবন। এই দুর্যোগে এখনও পর্যন্ত চার শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি দিবাং ভ্যালিতে হড়পা বানের জেরে সেনা শিবিরের দুটি আশ্রয়স্থল ভেসে যাওয়ার পর **পাঁচ সেনা জওয়ান নিখোঁজ** বলে খবর। তাঁদের সন্ধানে জোরকদমে উদ্ধার অভিযান চলছে।
প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে উদ্ধারকাজ চালানো। একটানা বৃষ্টির কারণে বহু রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেতু ও কালভার্ট ভেঙে পড়েছে। ফলে একদিকে যেমন দুর্গতদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে নিখোঁজ সেনা জওয়ানদের খোঁজেও তৈরি হচ্ছে একাধিক বাধা।
## ভূমিধসে চাপা পড়ে মৃত্যু চার শ্রমিকের
শুক্রবার সন্ধ্যার পর আপার সুবানসিরি জেলার কেওজারিং-বায়াচিং সড়কে আচমকাই বড়সড় ভূমিধস নামে। সেই সময় রাস্তার কাজে যুক্ত বেশ কয়েকজন শ্রমিক সেখানে ছিলেন। আচমকা পাহাড়ের মাটি ও ধস নেমে আসায় তাঁরা তার নিচে চাপা পড়েন।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকারীদের সামনে বড় বাধা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত চার শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সরকারি সূত্রে তাঁদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই ঘটনা অরুণাচলের পাহাড়ি এলাকায় প্রবল বর্ষণের সময় ভূমিধসের ভয়াবহতার বিষয়টিও সামনে এনেছে। রাস্তা নির্মাণ বা সংস্কারের মতো কাজ চলা এলাকাগুলিতে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
## হড়পা বানে ভেসে গেল সেনা শিবিরের আশ্রয়স্থল
অন্যদিকে আরও বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দিবাং ভ্যালিতে। প্রবল বৃষ্টির পর আচমকা হড়পা বান নেমে আসে এবং **Pasu Pani এলাকায় 5 Grenadiers-এর একটি সেনা ক্যাম্পের দুটি shelter ভেসে যায়**। সেই সময় সেখানে থাকা সাত সেনা জওয়ান জলের স্রোতে ভেসে যান। তাঁদের মধ্যে দুজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও পাঁচজন এখনও নিখোঁজ।
নিখোঁজ পাঁচ সেনা সদস্যের মধ্যে রয়েছেন হাবিলদার উপেন্দর এবং সেনা সদস্য কুন্দন, বিনোদ, আদিত্য ও সামুন্ডা বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের সন্ধানে ইতিমধ্যেই বিশেষ search and rescue teams মোতায়েন করা হয়েছে।
## জোরকদমে চলছে উদ্ধার অভিযান
নিখোঁজ সেনা জওয়ানদের সন্ধানে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থাকে কাজে নামানো হয়েছে। 5 Grenadiers-এর দুটি search and rescue team ইতিমধ্যেই অভিযান শুরু করেছে। পাশাপাশি Indo-Tibetan Border Police-এর 58th Battalion, General Reserve Engineer Force-এর 62 RCC, অরুণাচল প্রদেশ পুলিশ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরাও উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছেন।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির মধ্যে উদ্ধার অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন। কোথাও রাস্তার উপর ধস নেমেছে, কোথাও আবার জলস্রোতের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলকে প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে।
## দুই জওয়ানকে জীবিত উদ্ধার
হড়পা বানের সময় মোট সাত সেনা সদস্য জলের স্রোতে ভেসে গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। তাঁদের মধ্যে দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাকি পাঁচজনের এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি।
এই পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী দলের প্রধান লক্ষ্য নিখোঁজ পাঁচজনকে দ্রুত খুঁজে বের করা। প্রবল স্রোত, কাদামাটি এবং ধসে পড়া জমির কারণে অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## একাধিক জেলায় বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা
প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব শুধু প্রাণহানিতেই সীমাবদ্ধ নেই। অরুণাচল প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে **২৩৫টি রাস্তা, ৪০টি সেতু এবং ৭৫টি কালভার্ট** ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি জল সরবরাহ ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, **৩৭৩টি জল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ৮২৩টি বিদ্যুতের খুঁটি** ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১২২টি সরকারি ভবনও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ফলে বহু জায়গায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের পরিষেবা স্বাভাবিক রাখাও প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
## স্বাধীনতা দিবসের আগে বড় ধাক্কা
দেশ যখন স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় অরুণাচল প্রদেশে এমন ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক জীবন কার্যত থমকে গিয়েছে।
প্রশাসনের সামনে এখন একসঙ্গে একাধিক দায়িত্ব। একদিকে নিখোঁজ সেনা জওয়ানদের সন্ধান, অন্যদিকে ধসে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও সেতু পুনরুদ্ধার। পাশাপাশি দুর্গত মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয় জল ও অন্যান্য সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলছে।
## কেন এতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হল?
অরুণাচল প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে ভূমিধসের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। তার সঙ্গে যদি হঠাৎ প্রবল জলস্রোত তৈরি হয়, তখন flash flood বা হড়পা বান ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এবারও লাগাতার ভারী বৃষ্টির পর একাধিক এলাকায় একইসঙ্গে ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ি নদী ও নালার জলস্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় নিচু এলাকাগুলিও বিপদের মুখে পড়েছে।
## উদ্ধারকাজে একাধিক সংস্থার সমন্বয়
এ ধরনের দুর্যোগে শুধু একটি সংস্থার পক্ষে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব নয়। সেনাবাহিনী, ITBP, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট, স্থানীয় পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের একসঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে যেখানে রাস্তা ভেঙে গেছে বা সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে উদ্ধারকারী দলকে বিকল্প পথ খুঁজে এগোতে হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডে সামান্য বৃষ্টিও উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
এই কারণেই নিখোঁজ সেনা সদস্যদের সন্ধানে একাধিক দলকে কাজে লাগানো হয়েছে।
## সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কবার্তা
প্রশাসনের তরফে বিপজ্জনক পাহাড়ি এলাকা এবং ভূমিধসপ্রবণ অঞ্চলে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির সময় অপ্রয়োজনে পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াত না করা এবং নদী বা জলস্রোতের কাছাকাছি না যাওয়াই নিরাপদ।
ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে এমন এলাকায় মাটি বা পাহাড়ের ঢালে ফাটল দেখা দিলে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়া প্রয়োজন। একইভাবে হঠাৎ নদীর জল বেড়ে গেলে জল পার হওয়ার চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে।
## পরিকাঠামো পুনরুদ্ধারও বড় চ্যালেঞ্জ
প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনাই আপাতত সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলেও, পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের সামনে আরও একটি বড় কাজ অপেক্ষা করছে—ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো পুনর্গঠন।
শত শত রাস্তা, সেতু এবং কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করতে সময় লাগতে পারে। বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহ স্বাভাবিক করাও জরুরি।
যতক্ষণ না যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হচ্ছে, ততক্ষণ দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও জরুরি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে থাকবে।
## এখনও উদ্বেগে পাঁচ সেনা পরিবারের সদস্য
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হল নিখোঁজ পাঁচ সেনা জওয়ান। তাঁদের সহকর্মী এবং পরিবারের সদস্যরা এখন উদ্ধার অভিযানের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও বাকি পাঁচজনের অবস্থান এখনও অজানা। উদ্ধারকারী দল তাঁদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
এই মুহূর্তে প্রত্যাশা, আবহাওয়া কিছুটা অনুকূল হলে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা সম্ভব হবে এবং নিখোঁজ জওয়ানদের দ্রুত খুঁজে পাওয়া যাবে।
## সামনে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন
অরুণাচল প্রদেশে চলতি বর্ষায় একের পর এক ভূমিধস ও বন্যার ঘটনা পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকির বিষয়টি ফের সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির সময় ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই আবহাওয়ার সতর্কতা মেনে চলা, প্রশাসনের নির্দেশ অনুসরণ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা।
## শেষ কথা
অরুণাচল প্রদেশে প্রবল বৃষ্টি, ভূমিধস এবং হড়পা বানের জেরে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আপার সুবানসিরিতে ভূমিধসে চার শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে দিবাং ভ্যালিতে flash flood-এর জেরে সেনা শিবিরের দুটি shelter ভেসে যাওয়ায় পাঁচ সেনা জওয়ান নিখোঁজ। মোট সাতজন জওয়ান জলের স্রোতে ভেসে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ পাঁচ জওয়ানের সন্ধানে সেনাবাহিনী, ITBP, GREF, পুলিশ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একাধিক দল উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। একইসঙ্গে প্রবল বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, সেতু, জল সরবরাহ ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো পুনরুদ্ধারের কাজও প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, দ্রুত নিখোঁজ সেনা জওয়ানদের সন্ধান মিলবে এবং দুর্গত এলাকাগুলিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।


