দুর্গাপুজোর আবহে বাংলার রাজনীতিতে ফের সামনে এলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তবে এবার কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা সামাজিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নয়, বরং রাজনৈতিক তরজায়। সিপিএমের পার্টি স্টলে কোন ধরনের বই রাখা হচ্ছে, তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সমালোচনার পালটা দিতে স্বামী বিবেকানন্দকেই হাতিয়ার করলেন বামেদের তরুণ নেতা শতরূপ ঘোষ। তাঁর দাবি, সিপিএমের পার্টি স্টলে স্বামী বিবেকানন্দের লেখা এবং তাঁকে নিয়ে লেখা একাধিক বই পাওয়া যায়।
শুধু তাই নয়, শতরূপের বক্তব্য, বাঙালিকে মার্ক্স ও লেনিনের বই পড়তে প্রথম উৎসাহিত করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের নিজের ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত। এই মন্তব্যকে ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ, অতীতে বামপন্থী রাজনীতির একাংশের তরফে বিবেকানন্দের ভাবধারা ও ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। ফলে আজকের দিনে তাঁকেই রাজনৈতিক যুক্তির ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে কটাক্ষ করছে বিরোধী শিবির।
## পুজোর বুকস্টল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আক্রমণ
দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সামনে সিপিএমের বুকস্টল বসানো নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। লাল শালু ও দলীয় পতাকা দিয়ে সাজানো সেই স্টলে মূলত মার্ক্স, লেনিন এবং বামপন্থী মতাদর্শের বই রাখা হয়—এমন অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
শনিবারও তিনি বামেদের উদ্দেশে তীব্র কটাক্ষ করেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে যারা পুজো, পঞ্জিকা, শাস্ত্র, পুরোহিত, মন্ত্রোচ্চারণ এবং সাত্ত্বিকতার বিরোধিতা করেছে, তারাই এখন দুর্গাপুজোর মণ্ডপের কাছে বুকস্টল বসাচ্ছে। কিন্তু সেই স্টলে স্বামী বিবেকানন্দ, লোকেশ্বরানন্দজি বা ভারত সেবাশ্রম সংঘের লেখা বই পাওয়া যায় না। বরং সেখানে কার্ল মার্ক্স ও লেনিনের বই রাখা হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও উঠে আসে হনুমান চালিশা, ভারতভাগ এবং বাংলার ইতিহাস সংক্রান্ত বইয়ের প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, বামেদের বুকস্টলে জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় ভাবধারার বইয়ের উপস্থিতি নেই। এই মন্তব্যের পরেই পালটা আক্রমণে নামে সিপিএম।
## শতরূপ ঘোষের পালটা দাবি
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিপিএমের তরুণ নেতা শতরূপ ঘোষ সামাজিক মাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তাঁর দাবি, সিপিএমের পার্টি স্টলে স্বামী বিবেকানন্দের লেখা এবং বিবেকানন্দকে নিয়ে লেখা—দুই ধরনেরই একাধিক বই রয়েছে।
শতরূপের বক্তব্য, “আমাদের পার্টি স্টলে বিবেকানন্দের লেখা এবং বিবেকানন্দকে নিয়ে লেখা একাধিক বই পাওয়া যায়।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, বাঙালিকে প্রায় ১২০ বছর আগে মার্ক্স ও লেনিনের বই পড়তে যিনি প্রথম শিখিয়েছিলেন, তিনি স্বামী বিবেকানন্দের নিজের ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত।
এই যুক্তির মাধ্যমে শতরূপ বোঝাতে চেয়েছেন, বিবেকানন্দকে শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা যায় না। তাঁর পরিবার, ভাবনা এবং সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে বামপন্থী চিন্তারও কিছু যোগ রয়েছে। তবে এই বক্তব্য নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক চাপানউতোর।
## ভূপেন্দ্রনাথ দত্তকে সামনে আনল বামেরা
স্বামী বিবেকানন্দের ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিপ্লবী এবং পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। বামেদের দাবি, ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক ভূমিকা বাংলায় মার্ক্সবাদী চিন্তার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
শতরূপ ঘোষের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে সামনে আনা। তাঁর যুক্তি, একই পরিবারে স্বামী বিবেকানন্দের মতো আধ্যাত্মিক ও জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিত্ব যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত। তাই বিবেকানন্দের নামের সঙ্গে বামপন্থী ইতিহাসের কোনও সম্পর্ক নেই—এমন দাবি করা ঠিক নয়।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই যুক্তি মূল বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ, স্বামী বিবেকানন্দের নিজস্ব দর্শন, ধর্মভাবনা, জাতীয়তাবাদ এবং মানবসেবার আদর্শকে তাঁর ভাইয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যায় না। দু’জনের জীবন ও চিন্তার ক্ষেত্র আলাদা ছিল।
## অতীতে বিবেকানন্দকে কীভাবে দেখত বামেরা?
বিবেকানন্দকে ঘিরে বামেদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে মূলত অতীতের রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একসময় বামপন্থী নেতাদের একটি অংশ স্বামী বিবেকানন্দকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছিলেন। মানবেন্দ্রনাথ রায় থেকে শুরু করে এ বি বর্ধন—বিভিন্ন বামপন্থী চিন্তাবিদ ও নেতার বক্তব্যে বিবেকানন্দের ধর্মীয় দর্শন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
কেউ তাঁকে হিন্দুধর্মের প্রচারক হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ ধর্মীয় আগ্রাসনের প্রতীক হিসেবে সমালোচনা করেছেন। বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক ভাবনা ও জাতীয়তাবাদী বক্তব্যকে বামপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মনে করা হয়েছিল।
এই ইতিহাসের কথা তুলে ধরে বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি সিপিএমকে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একসময় যাঁকে বামেরা ‘ভণ্ড সন্ন্যাসী’ বলত, আজ রাজনৈতিক প্রয়োজনেই সেই বিবেকানন্দের প্রশংসা করতে হচ্ছে। তাঁর মতে, রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বামেদের অবস্থানও বদলে গিয়েছে।
## রাজনৈতিক প্রয়োজনেই কি বিবেকানন্দ?
বিবেকানন্দকে ঘিরে এই বিতর্ক আসলে বাংলার রাজনীতিতে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অংশ। একদিকে বিজেপি ও শাসকপক্ষের বক্তব্য, বামেরা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী প্রতীকগুলিকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। অন্যদিকে বামেদের দাবি, বিবেকানন্দ কোনও একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নন। তাঁর চিন্তা, মানবসেবা, শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা সকলের জন্য প্রাসঙ্গিক।
সিপিএমের বুকস্টলে বিবেকানন্দের বই থাকার দাবি সেই অবস্থানকেই তুলে ধরেছে। বামেদের বক্তব্য, কোনও ব্যক্তিত্বকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সামাজিক ও মানবিক ভাবনাকেও পড়তে হবে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী বামেরা এখন বিবেকানন্দকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে।
## বাংলার রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে এই রাজনৈতিক বিতর্ক শুধু একটি বুকস্টল বা কয়েকটি বইয়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয়তাবাদ, বামপন্থা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা স্তর।
দুর্গাপুজোর সময়ে মণ্ডপের সামনে বইয়ের স্টলকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তা এখন বিবেকানন্দের দর্শন ও ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক ভূমিকা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পালটা দিতে গিয়ে শতরূপ ঘোষ যে যুক্তি দিয়েছেন, তা বামেদের সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে এই বিতর্কে একটি বিষয় স্পষ্ট—স্বামী বিবেকানন্দকে ঘিরে বাংলার রাজনৈতিক আগ্রহ এখনও অটুট। তিনি শুধু ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব নন, শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস, জাতীয় চেতনা এবং মানবসেবার প্রতীক হিসেবেও বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই কখনও তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, আবার কখনও রাজনৈতিক যুক্তির কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।


