পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনকে সামনে রেখে ফের প্রকাশ্যে এল বামফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে শরিক দলগুলির মধ্যে এখনও সম্পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়নি। বিশেষ করে রেজিনগর আসনকে কেন্দ্র করে সিপিএম ও আরএসপির মধ্যে টানাপড়েন চরমে উঠেছে। ফলে ভোটের প্রস্তুতি শুরু হলেও দুই কেন্দ্রে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে বামফ্রন্ট।
আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হওয়ার কথা। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই প্রার্থী ঘোষণা ও প্রচারের চাপ বাড়ছে রাজনৈতিক দলগুলির উপর। এই পরিস্থিতিতে বামফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ জোটের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
## রেজিনগর নিয়ে সিপিএম-আরএসপি সংঘাত
বামফ্রন্টের অন্দরে সবচেয়ে বড় জট তৈরি হয়েছে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর আসন নিয়ে। এই কেন্দ্রটি নিজেদের দাবি করে আসছে আরএসপি। দলটির বক্তব্য, রেজিনগরে দীর্ঘদিন ধরে তাদের সাংগঠনিক উপস্থিতি রয়েছে। সেই পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং সংগঠনের কথা মাথায় রেখে এবার আসনটি তাদের ছেড়ে দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, সিপিএম এই দাবি মানতে নারাজ। গত কয়েকটি নির্বাচনে রেজিনগরে সিপিএম প্রার্থী দিয়েছে। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংগঠনের শক্তি এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির নিরিখে এই আসনে লড়াই করার অধিকার তাদেরই রয়েছে বলে মনে করছে বড় শরিক দলটি।
দুই দলের যুক্তির সংঘাতেই তৈরি হয়েছে জটিলতা। আরএসপির অভিযোগ, আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে ছোট শরিকদের দাবিকে বারবার উপেক্ষা করা হচ্ছে। সিপিএমের পাল্টা যুক্তি, শুধু পুরনো দাবি বা ঐতিহাসিক উপস্থিতির ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা যায় না। বর্তমান সংগঠন, ভোটের বাস্তবতা এবং জয়ের সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।
এই মতপার্থক্যের জেরে বামফ্রন্টের বৈঠকেও উত্তেজনা তৈরি হয় বলে সূত্রের খবর। শরিকদের মধ্যে আলোচনা হলেও রেজিনগর নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী ঘোষণার বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
## নন্দীগ্রাম নিয়েও শরিকদের দাবি
নন্দীগ্রাম আসন নিয়েও বামফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এই কেন্দ্রটি সিপিআই নিজেদের জন্য দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, আগের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে বামফ্রন্টের হয়ে সিপিআই প্রার্থী দিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও আসনটি তাদের হাতে থাকা উচিত।
সিপিআইয়ের আরও অভিযোগ, আগের নির্বাচনে আসনটি তাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও সিপিএম পরে আইএসএফকে সমর্থন করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার কোনওভাবেই নন্দীগ্রাম ছাড়তে রাজি নয় সিপিআই। শরিকদের মধ্যে আসন সমঝোতার পুরনো রীতি এবং রাজনৈতিক বোঝাপড়াকে সম্মান করার দাবি জানিয়েছে তারা।
তবে রেজিনগরের তুলনায় নন্দীগ্রাম নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা পরিষ্কার বলে জানা যাচ্ছে। মূল বিরোধ এখন রেজিনগর আসনকে কেন্দ্র করেই। তবুও নন্দীগ্রামে কোন দল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী দেবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত জল্পনা থেকেই যাচ্ছে।
## বিমান বসুর অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন
বামফ্রন্টের সাম্প্রতিক বৈঠকে চেয়ারম্যান বিমান বসুর অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শরিক দলগুলির একাংশের মতে, আসন ভাগাভাগির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিমান বসুর মতো অভিজ্ঞ নেতার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন শরিক দলের সঙ্গে সমন্বয় করার দক্ষতা এই ধরনের পরিস্থিতিতে জট কাটাতে সাহায্য করতে পারত।
তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে বৈঠকে ঐকমত্যে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন কয়েকজন শরিক নেতা। যদিও বাম নেতৃত্বের তরফে প্রকাশ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবু বৈঠক নিষ্ফলা হওয়ার পিছনে বিষয়টি অন্যতম কারণ কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বামফ্রন্টের ভিতরে দীর্ঘদিন ধরেই বড় শরিক সিপিএম এবং ছোট শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে নানা সময়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এবারের উপনির্বাচনের আগে সেই পুরনো সমস্যাই নতুন করে সামনে এসেছে।
## দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপে বাম নেতৃত্ব
ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায় বামফ্রন্টের উপর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ বাড়ছে। প্রার্থী চূড়ান্ত না হলে প্রচার শুরু করা, বুথস্তরে সংগঠন সাজানো এবং কর্মীদের সক্রিয় করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে রেজিনগরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দেরি হলে তার প্রভাব ভোটের ফলেও পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বামফ্রন্ট নেতৃত্ব ফের আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিপিএম ও আরএসপির মধ্যে সমঝোতা করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। একইসঙ্গে নন্দীগ্রামে সিপিআইয়ের দাবিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শরিকদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি না হলে জোটের কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, উপনির্বাচন বামফ্রন্টের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার একটি সুযোগ। কিন্তু প্রার্থী বাছাই নিয়েই যদি প্রকাশ্য সংঘাত তৈরি হয়, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সংগঠন ও প্রচারে। বিশেষ করে তৃণমূল, বিজেপি এবং কংগ্রেস যখন নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে, তখন বামফ্রন্টের দেরি তাদের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
## জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই বামফ্রন্টের সামনে কঠিন রাজনৈতিক লড়াই। একদিকে রয়েছে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে বিজেপি ও কংগ্রেসও নিজেদের সংগঠন মজবুত করার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে বামফ্রন্ট যদি ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটে নামতে না পারে, তাহলে তাদের ভোটব্যাঙ্ক আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বাম নেতৃত্বের আশা, আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হবে। শরিক দলগুলির মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। এখন দেখার, রেজিনগর নিয়ে সিপিএম ও আরএসপি নিজেদের অবস্থান থেকে কতটা সরে আসে এবং নন্দীগ্রামে সিপিআইয়ের দাবি কীভাবে মান্যতা পায়।
সব মিলিয়ে, উপনির্বাচনের আগে প্রার্থী বাছাই ঘিরে বামফ্রন্টের অন্দরের কোন্দল ফের প্রকাশ্যে। ভোটের ময়দানে নামার আগেই এই জট কাটাতে না পারলে তার প্রভাব শুধু প্রার্থী ঘোষণায় নয়, গোটা নির্বাচনী প্রচার এবং জোটের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণেও পড়তে পারে।


