সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকে ঘিরে ফের সরব হলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর দাবি, বিষয়টি শুধুমাত্র বেআইনি প্রবেশ বা জনবিন্যাস পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। অনুপ্রবেশের আড়ালে সীমান্তবর্তী এলাকায় জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের যাতায়াত এবং স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির অভিযোগ তুলে তিনি এই ঘটনাকে ‘র্যাডিক্যাল অ্যাগ্রেশন’ বা উগ্রপন্থী আগ্রাসন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় জাল আধার ও প্যান কার্ড তৈরির চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বারাসত-টাকি রোডের শিমুলতলায় একটি সেবাশিবিরে বক্তব্য রাখার সময় এই মন্তব্য করেন শমীক ভট্টাচার্য। চাকলা ও কচুয়া ধামের পুণ্যার্থীদের জন্য সমাজসেবী সুবীর শীলের পৃষ্ঠপোষকতায় ওই সেবাশিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনবিন্যাস নিয়ে যে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, তা নতুন করে সামনে আনেন।
### ‘সাইলেন্ট ডেমোগ্রাফিক ইনভেশন’-এর দাবি
শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যে উঠে আসে ‘সাইলেন্ট ডেমোগ্রাফিক ইনভেশন’-এর প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, আশির দশক থেকেই এই ধরনের পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ধীরে ধীরে জনবিন্যাসে পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের ভিতরে একটি বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই প্রক্রিয়াকে শুধুমাত্র জনসংখ্যার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। তাঁর মতে, এর সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার বিষয়ও জড়িত। বক্তব্যে তিনি এমনও দাবি করেন যে, ‘বিনা যুদ্ধে’ ভারতবর্ষকে দখলের একটি ষড়যন্ত্র চলছে। তবে এই ধরনের রাজনৈতিক অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
### সীমান্ত জেলাকে ‘করিডোর’ করার অভিযোগ
বিজেপির রাজ্য সভাপতির আরও অভিযোগ, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিকে ব্যবহার করে জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা যাতায়াত করছে। শুধু যাতায়াত নয়, ওই এলাকাগুলিতে স্থায়ী ডেরা তৈরি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এই বক্তব্যের সূত্র ধরে সীমান্ত নিরাপত্তা ও বেআইনি অনুপ্রবেশ নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে ফের চাপানউতোর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শমীকের দাবি, সীমান্ত এলাকায় বেআইনি নথিপত্র তৈরির একটি চক্রও সক্রিয়। বিশেষ করে জাল আধার কার্ড এবং জাল প্যান কার্ড তৈরির ‘হাব’ হয়ে উঠেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য, বেআইনি পরিচয়পত্র তৈরির এই ব্যবস্থা বন্ধ না করা গেলে অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তা—দুই সমস্যাই আরও জটিল হতে পারে।
### ‘যে কোনও মূল্যে বন্ধ করতে হবে’
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েও একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেন শমীক। তাঁর বক্তব্য, জাল পরিচয়পত্র তৈরির কারবার এবং সীমান্তকে ব্যবহার করে সন্দেহজনক যাতায়াত—দুটিই বন্ধ করা প্রয়োজন। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘যে কোনও মূল্যে’ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিজেপি এই ইস্যুকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে সরব হয়ে থাকে। অন্যদিকে বিরোধীরা প্রায়শই অভিযোগ করে, অনুপ্রবেশের মতো বিষয়কে রাজনৈতিক মেরুকরণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শমীকের সাম্প্রতিক মন্তব্যও রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
### বাংলাদেশ প্রসঙ্গেও সরব
এদিনের বক্তব্যে প্রতিবেশী বাংলাদেশে মন্দির, ইসকন এবং বাঙালি ঐতিহ্যের উপর হামলার অভিযোগও তোলেন শমীক ভট্টাচার্য। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও বাঙালি ঐতিহ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি ঐক্যের বার্তা দেন। তাঁর বক্তব্যে সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দুই দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গও উঠে আসে।
তবে বাংলাদেশে নির্দিষ্ট ঘটনাগুলি নিয়ে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগের পরিসরে রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার স্বাধীন যাচাই ছাড়া সেগুলিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
### ওয়াকফ নিয়েও তৃণমূলকে নিশানা
অনুপ্রবেশের পাশাপাশি ওয়াকফ ইস্যুতেও তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের আমলে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে অনিয়ম এবং লুটের ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরোধিতার নামে হামলা এবং বাড়ি-সম্পত্তি লুটের অভিযোগও করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, সীমান্ত সুরক্ষা, অনুপ্রবেশ, জাল পরিচয়পত্র এবং ওয়াকফ—একাধিক স্পর্শকাতর ইস্যুকে একই মঞ্চ থেকে সামনে এনে রাজ্য রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন শমীক ভট্টাচার্য। বিশেষ করে অনুপ্রবেশকে ‘র্যাডিক্যাল অ্যাগ্রেশন’ হিসেবে তাঁর ব্যাখ্যা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগগুলি নিয়ে প্রশাসন বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির পরবর্তী প্রতিক্রিয়া এখন নজরে থাকবে।


