ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে চলেছে। আমেরিকার কাছ থেকে জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল সিস্টেম কেনার পথে এগোল ভারত। ২৮ আগস্ট মার্কিন দূতাবাসের তরফে জানানো হয়, ভারতীয় সেনা আমেরিকার সঙ্গে জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল সিস্টেম সংগ্রহের জন্য চুক্তি করেছে। চুক্তির আর্থিক মূল্য অবশ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর এই চুক্তিকে ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও সামনে এসেছে।
## জ্যাভলিন মিসাইল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জ্যাভলিন মূলত একটি কাঁধে বহনযোগ্য অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল ব্যবস্থা। এর প্রধান লক্ষ্য শত্রুর ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাঙ্কবিধ্বংসী অস্ত্রের গুরুত্ব অনেক। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে হালকা অস্ত্র সেনাদের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
জ্যাভলিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, লক্ষ্যবস্তুতে মিসাইল লক করার পর এটি নিজস্ব গাইডেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। ফলে অপারেটরকে পুরো উড়ানপথে মিসাইলকে ম্যানুয়ালি পরিচালনা করতে হয় না।
## আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি কেন তাৎপর্যপূর্ণ?
জ্যাভলিন কেনার বিষয়টি ভারত ও আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার আরও একটি উদাহরণ।
সম্প্রতি ভারত ও আমেরিকার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার জন্য ১০ বছরের একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তার পরেই জ্যাভলিন সংগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরও এই চুক্তিকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
## ২০১০ সাল থেকেই জ্যাভলিনের দিকে নজর ভারতের
ভারতীয় সেনার জন্য জ্যাভলিন সংগ্রহের চেষ্টা অবশ্য নতুন নয়। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকেই এই মার্কিন অস্ত্র কেনার বিষয়ে ভারত আগ্রহ দেখিয়ে আসছে।
কিন্তু এতদিন অন্যতম বড় সমস্যা ছিল প্রযুক্তি হস্তান্তর। জ্যাভলিনের প্রযুক্তি ভারতকে দেওয়ার বিষয়ে আমেরিকার আপত্তি ছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এবার শুধু অস্ত্র কেনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## ১০১টি মিসাইল ও ২৫টি লঞ্চ ইউনিটের প্যাকেজ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে আমেরিকা ভারতকে জ্যাভলিন বিক্রির জন্য প্রায় ৯৩ মিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল।
সেই প্যাকেজে ১০১টি জ্যাভলিন মিসাইল এবং ২৫টি লঞ্চ ইউনিট অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানানো হয়েছে। প্রতিটি মিসাইলের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১.৭৮ লক্ষ ডলার বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে বর্তমান চুক্তির অধীনে ঠিক কতগুলি সিস্টেম বা মিসাইল সরবরাহ করা হবে এবং চূড়ান্ত আর্থিক কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। মার্কিন পক্ষও বর্তমান চুক্তির মূল্য প্রকাশ করেনি।
## যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত অস্ত্র জ্যাভলিন
জ্যাভলিনকে একটি battle-tested বা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অ্যান্টি-আর্মার সিস্টেম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমেরিকার Raytheon এবং Lockheed Martin যৌথভাবে এই অস্ত্র তৈরি করে।
এর লক্ষ্য শত্রুর সাঁজোয়া যানকে দ্রুত আঘাত করা। বিশেষ করে ট্যাঙ্কের অপেক্ষাকৃত দুর্বল উপরের অংশে আঘাত করার ক্ষমতা জ্যাভলিনের অন্যতম আলোচিত বৈশিষ্ট্য।
এই কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বিশ্লেষণে জ্যাভলিনকে আধুনিক অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়।
## ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ প্রযুক্তি কী?
জ্যাভলিনের অন্যতম বড় সুবিধা হল এর ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ ধরনের ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ লক্ষ্য নির্ধারণ ও লক করার পর অপারেটরকে পুরো সময় মিসাইলকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে নির্দেশ করে যেতে হয় না।
এতে একজন সেনা জওয়ান মিসাইল উৎক্ষেপণের পর দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের সক্ষমতা সেনাদের নিরাপত্তা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিতে পারে।
## ট্যাঙ্কের উপরের অংশে আঘাত
জ্যাভলিনের আক্রমণ পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর ‘top attack’ সক্ষমতা।
সাধারণত ট্যাঙ্কের সামনের অংশে অত্যন্ত শক্তিশালী বর্ম থাকে। কিন্তু ট্যাঙ্কের উপরের অংশ তুলনামূলকভাবে কম সুরক্ষিত হতে পারে। জ্যাভলিন সেই দুর্বল অংশকে লক্ষ্য করে আঘাত করতে পারে।
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিসাইলটি প্রায় ১৫০ মিটার উচ্চতায় উঠে ট্যাঙ্কের উপরের অংশে আঘাত করতে সক্ষম।
## ২.৫ থেকে ৪.৭ কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্যাভলিনের কার্যকর পাল্লা প্রায় ২.৫ কিলোমিটার থেকে ৪.৭ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
তবে নির্দিষ্ট সংস্করণ, ব্যবহারের পরিবেশ এবং অপারেশনাল পরিস্থিতির উপর কার্যকর পরিসর নির্ভর করতে পারে।
এর কাঁধে বহনযোগ্য নকশা সেনাদের দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অস্ত্রটি নিয়ে যাওয়ার সুবিধা দেয়।
## ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর সঙ্গেও যোগসূত্র
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল ভবিষ্যতে ভারতে জ্যাভলিন তৈরির সম্ভাবনা।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ও আমেরিকা যৌথভাবে এই মিসাইল উৎপাদনের দিকে এগোতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই সহযোগিতা শুধু অস্ত্র আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হতে পারে।
এটি ভারতের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদন স্থানীয়করণের লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
## অপারেশন সিঁদুরের পর কেন গুরুত্ব বাড়ল?
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত এবং অপারেশন সিঁদুরের পর জরুরি ভিত্তিতে জ্যাভলিন কেনার সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আসে।
যদিও বর্তমান চুক্তির নির্দিষ্ট অপারেশনাল উদ্দেশ্য নিয়ে সব তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা যে গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট।
## ভারতের অস্ত্রভাণ্ডারে আরও একাধিক সংযোজন
জ্যাভলিন কেনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ভারত বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছে।
এর মধ্যে দেশীয়ভাবে তৈরি AK-203 রাইফেল, রাশিয়ার R-37M-এর মতো দূরপাল্লার এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল এবং DRDO-র বিভিন্ন প্রযুক্তি দেশীয় সংস্থাগুলির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
অর্থাৎ, ভারতের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণে একইসঙ্গে আমদানি, যৌথ উৎপাদন এবং দেশীয় প্রযুক্তি—তিনটি ক্ষেত্রেই জোর দেওয়া হচ্ছে।
## ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
গত কয়েক বছরে ভারত ও আমেরিকার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হয়েছে। বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি এবং যৌথ মহড়ার ক্ষেত্রে দুই দেশ সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
জ্যাভলিন চুক্তি সেই ধারারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বিশেষ করে যদি ভবিষ্যতে ভারতে এই অস্ত্রের যৌথ উৎপাদন শুরু হয়, তাহলে তা দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতাকে আরও গভীর করতে পারে।
## শেষ কথা
ভারতীয় সেনার জন্য আমেরিকা থেকে জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল সিস্টেম সংগ্রহের চুক্তি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে চলেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত, কাঁধে বহনযোগ্য এবং ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষমতার জন্য জ্যাভলিন সেনাবাহিনীর অ্যান্টি-আর্মার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের দিকে এগোতে পারে। ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র আমেরিকা থেকে একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
এখন নজর থাকবে জ্যাভলিনের কতগুলি ইউনিট ভারত পাবে, সরবরাহের সময়সূচি কী হবে এবং ভারতে যৌথ উৎপাদন বাস্তবে কবে শুরু হয় তার দিকে।


