ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তরের বিলবোর্ড খুলে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবার পৌঁছল কলকাতা হাই কোর্টে। কিন্তু আদালতের তরফে এই মুহূর্তে কোনও অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ পেল না তৃণমূল। বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ, যে হোর্ডিং ইতিমধ্যেই খুলে ফেলা হয়েছে, সেখানে নতুন করে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার ক্যামাক স্ট্রিটে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। কলকাতা পুরসভার কর্মীরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে বিলবোর্ড সরাতে গেলে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বচসা ও ধস্তাধস্তি হয়। পরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
## কী হয়েছিল ক্যামাক স্ট্রিটে?
বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতা পুরসভার একটি দল পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তরে যায়। সেখানে থাকা ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ লেখা বড় বিলবোর্ড সরানোর কাজ শুরু হয়।
পুরসভার দাবি ছিল, ওই কাঠামো বা হোর্ডিংটি অনুমোদন ছাড়াই লাগানো হয়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই সেটি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কিন্তু পুরকর্মী ও পুলিশের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
## অভিষেকের দপ্তরের সামনে ধস্তাধস্তি
বিলবোর্ড খোলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ তৃণমূলের একাধিক নেতা। পুরসভা ও পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে আপত্তি জানান তাঁরা।
অভিষেকের অভিযোগ ছিল, অফিসে ঢোকার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁদের যথাযথ নির্দেশের কপি দেখাতে পারেনি। তিনি অভিযানের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
অন্যদিকে পুলিশের অভিযোগ, বিলবোর্ড সরানোর কাজে বাধা দেওয়া হয় এবং কয়েকজন পুলিশকর্মীর সঙ্গে ধস্তাধস্তিও হয়।
## বিলবোর্ড শেষ পর্যন্ত খুলে ফেলা হয়
বিরোধিতা ও উত্তেজনার মধ্যেই শেষ পর্যন্ত কলকাতা পুরসভার কর্মীরা বিলবোর্ডটি খুলে ফেলেন। ঘটনার পর ওই এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং পুলিশি তৎপরতাও বাড়ানো হয়।
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনায় পুলিশ ও পুরসভার কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অর্থাৎ, বিলবোর্ড সংক্রান্ত বিরোধ শুধু রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা পুলিশের মামলা ও গ্রেপ্তার পর্যন্ত গড়িয়েছে।
## হাই কোর্টের দ্বারস্থ তৃণমূল
বিলবোর্ড খুলে ফেলার পরই বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয় তৃণমূল। শুক্রবার সকালে দলের আইনজীবী কিশোর দত্ত কলকাতা হাই কোর্টে বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তিনি আদালতকে জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলেই কলকাতা পুরসভার কর্মীরা অফিসে গিয়ে বিলবোর্ড খুলে ফেলার কাজ করেন। বিষয়টি নিয়ে আগেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়েছিল বলেও আদালতে দাবি করা হয়।
দলের পক্ষ থেকে দ্রুত শুনানির আর্জিও জানানো হয়।
## মামলা দায়েরের অনুমতি বিচারপতির
বিষয়টি শুনে বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী মামলা দায়ের করে তার নম্বর নিয়ে আসতে বলেন। মামলার নম্বর ছাড়া শুনানি করা সম্ভব নয় বলেও তিনি জানান।
পাশাপাশি, মামলার অন্য পক্ষগুলিকেও বিষয়টি জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর ফলে তৃণমূলের আবেদন আদালতে গ্রহণের পথ খুললেও সঙ্গে সঙ্গে কোনও সুরক্ষা বা প্রতিকার মেলেনি।
## ‘হোর্ডিং তো খুলেই ফেলা হয়েছে’
শুক্রবার শুনানির সময় আদালতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল—বিলবোর্ড ইতিমধ্যেই খুলে ফেলা হয়েছে। ফলে এখনই সেটি নিয়ে নতুন করে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরীর বক্তব্যের সারকথা ছিল, **হোর্ডিং যখন ইতিমধ্যেই খুলে দেওয়া হয়েছে, তখন নতুন করে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।**
এই পর্যবেক্ষণের ফলে তৃণমূলের পক্ষ থেকে চাওয়া তাৎক্ষণিক স্বস্তি পাওয়া গেল না।
## আদালত কি পুরসভার পদক্ষেপকে বৈধ বলেছে?
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আদালত এই পর্যায়ে বিলবোর্ড খুলে ফেলার পুরসভার পদক্ষেপকে চূড়ান্তভাবে বৈধ বা অবৈধ বলে রায় দেয়নি।
মূলত বিলবোর্ড ইতিমধ্যেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে—এই বাস্তবতার ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে। মামলাটি পরবর্তী শুনানিতে আরও বিস্তারিতভাবে বিবেচিত হতে পারে।
তাই আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে পুরসভার পদক্ষেপের চূড়ান্ত আইনি ছাড়পত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
## রাজনৈতিক বিতর্কও তুঙ্গে
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পুরসভা ও পুলিশের বক্তব্য, অনুমোদনহীন বা বেআইনি কাঠামোর বিরুদ্ধে নিয়ম মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ফলে বিলবোর্ড সরানোর ঘটনা এখন শুধু একটি নাগরিক বা পুর প্রশাসনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত এবং আইনি লড়াইও।
## পুলিশের মামলায় গ্রেপ্তার ১৩
ঘটনার পর পুলিশি পদক্ষেপও বিতর্কের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরসভা ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে অন্যান্য প্রতিবেদনে ঘটনার সময় পুলিশ ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির কথাও উঠে এসেছে। পুলিশ ঘটনার ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে তদন্ত করছে বলে জানা গিয়েছে।
## অভিষেকের অফিস ঘিরে কেন এত গুরুত্ব?
ক্যামাক স্ট্রিটের এই অফিসটি তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তর হিসেবে এটি দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক কার্যকলাপের অন্যতম কেন্দ্র।
ফলে সেই অফিসের ছাদে থাকা দলের নামের বড় বিলবোর্ড সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে।
এ কারণেই পুরসভার অভিযান এবং পরবর্তী সংঘাত দ্রুত রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
## এখন কী হবে?
আদালত এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ দেয়নি। তবে মামলাটি শেষ হয়ে যায়নি। পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য, নথি ও হলফনামা আদালতের সামনে আসতে পারে।
অর্থাৎ, বিলবোর্ড আপাতত নেই, কিন্তু তার বৈধতা, সেটি সরানোর প্রক্রিয়া এবং ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি এখনও বাকি।
## শেষ কথা
ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তরের বিলবোর্ড খুলে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাত তৈরি হয়েছে, তার প্রথম পর্বে তৃণমূল কোনও অন্তর্বর্তী স্বস্তি পেল না।
কলকাতা হাই কোর্ট স্পষ্ট করেছে, বিলবোর্ড ইতিমধ্যেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে সেটিকে ঘিরে নতুন করে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিলবোর্ড সরানোর পুরো ঘটনাটি আদালত বৈধ বলে মেনে নিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানিতেই স্পষ্ট হতে পারে, কলকাতা পুরসভার পদক্ষেপের আইনি বৈধতা নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত অবস্থান কী।
এদিকে ১৩ জনের গ্রেপ্তার এবং ঘটনাস্থলের ধস্তাধস্তি নিয়ে তদন্তও চলবে। ফলে ক্যামাক স্ট্রিটের এই বিলবোর্ড বিতর্ক আপাতত থামছে না—রাজনৈতিক ময়দান ও আদালত, দুই জায়গাতেই এর রেশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।


