বিশ্ব অর্থনীতিতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানির দামের ওঠানামার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ভারতের অর্থনীতি আগামী দিনেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখবে বলে আশাবাদী অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা। তাঁদের মতে, দেশের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, অবকাঠামো উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার এবং উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ ভারতের অর্থনৈতিক গতিকে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনও বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভারত বিশ্বের দ্রুততম বিকাশমান বৃহৎ অর্থনীতিগুলির মধ্যে অন্যতম। তাঁর বক্তব্য, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতি, শিল্প ও পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ফলে দেশের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হল দেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। বিদেশে চাহিদা কিছুটা কমলেও দেশের ভোগব্যয়, পরিষেবা খাত এবং উৎপাদন শিল্প অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। পাশাপাশি রেল, সড়ক, বন্দর, বিমানবন্দর ও ডিজিটাল অবকাঠামোতে সরকারি মূলধনী বিনিয়োগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কও ভারতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী বলে উল্লেখ করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম, দুর্বল বর্ষা এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মতো বিষয়গুলির উপর নজর রাখা হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থনীতি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে বলে মত আরবিআই গভর্নরের।
বিশ্বব্যাঙ্ক, আইএমএফ এবং ওইসিডি-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও ভারতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের মতে, কিছুটা ধীরগতি এলেও ভারত আগামী অর্থবর্ষেও বিশ্বের দ্রুততম বিকাশমান প্রধান অর্থনীতিগুলির মধ্যে থাকবে। যদিও আন্তর্জাতিক সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি বাজারের ওঠানামা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
উৎপাদন খাতেও ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI) প্রকল্প এবং নতুন বিনিয়োগের ফলে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল, প্রতিরক্ষা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় কর্মসংস্থান ও শিল্পোন্নয়নের সম্ভাবনাও জোরদার হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
এছাড়াও ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণ, ইউপিআই-ভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিকাশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দিচ্ছে। বিভিন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এবং রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগও দেশের শিল্পক্ষেত্রের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন শিল্পমহল।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে ভারতের অর্থনীতির উপরও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তাই অর্থনৈতিক সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ভারতের অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের শক্তি, সরকারি বিনিয়োগ, শিল্পোন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার কারণে আগামী দিনেও দেশের প্রবৃদ্ধির গতি বজায় থাকবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি।


