বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় পোশাক কারখানার কাছে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় জামগড়া চৌরাস্তা এলাকার প্রীতি গ্রুপের এফএনএস পোশাক কারখানার কাছে এই ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কারখানার কর্মী এবং পথচারী-সহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও দমকল সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টা নাগাদ কারখানার সীমানার কাছে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি একটি লরিতে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারখানার পাশাপাশি রাস্তা এবং পার্শ্ববর্তী দোকানগুলিতেও এর প্রভাব পড়ে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে ধাতব বস্তু ও সিলিন্ডারের অংশ ছিটকে গিয়ে আশপাশে পড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই ঘটনায় মৃত সাতজনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত একজনের পরিচয় জানা গিয়েছে। তাঁর নাম জয়নাব বেগম। তিনি কারখানার পাশেই একটি কাপড়ের দোকান চালাতেন। বিস্ফোরণের পর একটি গ্যাস সিলিন্ডার ছিটকে গিয়ে তাঁর দোকানের দিকে পড়ে এবং সেখানেই তিনি গুরুতরভাবে দগ্ধ হন বলে জানা গিয়েছে। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। বাকি ছয়জনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হওয়ায় তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করতে সময় লাগছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
দমকল বিভাগের আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় একাধিক দমকলের ইঞ্জিন। প্রথমে কয়েকটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আরও ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ছয়টি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চেষ্টা চালানোর পর রাত পৌনে ৯টা নাগাদ আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
দমকলের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি লরিতে বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল থেকে একাধিক দেহ উদ্ধার করা হয়। একটি দেহ লরির ভিতর থেকে পাওয়া যায়। আরও কয়েকটি দেহ লরির আশপাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিস্ফোরিত একটি সিলিন্ডার পাশের একটি দোকানে গিয়ে পড়ে। সেখানেই জয়নাব বেগমের মৃত্যু হয়। বিস্ফোরণের অভিঘাতে আরও কয়েকজন পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দা আহত হয়েছেন।
এদিকে আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালেও বহু আহতকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ১৬ জন সেখানে চিকিৎসা নিতে আসেন বা ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।
বিস্ফোরণের সময় কারখানায় কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রাথমিকভাবে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। তবে প্রীতি গ্রুপের এফএনএস কারখানার অ্যাডমিন-ম্যানেজার হেমায়েত উদ্দিন জানিয়েছেন, কারখানার ভিতরে কোনও শ্রমিক আটকে ছিলেন না। তাঁর দাবি, আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই কারখানার কর্মীরা বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে কারখানার সীমানার কাছে থাকা লরি এবং তার আশপাশে থাকা কয়েকজন আগুনে দগ্ধ হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বিস্ফোরণের ভয়াবহতার ছবিও সামনে এসেছে। স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের শব্দের পরই চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুন এবং বিস্ফোরণের অভিঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হন। স্থানীয় মানুষজন নিজেদের উদ্যোগেও আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করেন। রাস্তার পাশে থাকা রিকশাচালক-সহ কয়েকজনও আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
বিস্ফোরণের অভিঘাতে শুধু মানুষই আহত হননি, আশপাশের পরিকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বিস্ফোরণের পর ধাতব অংশ ও অন্যান্য বস্তু ছিটকে পড়ে কাছাকাছি বাড়িঘর এবং রাস্তায়। ফলে ঘটনাস্থলের চারপাশে আতঙ্ক আরও বাড়ে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর দমকল কর্মীরা এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। একইসঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজও শুরু হয়েছে।
এই ঘটনার সঠিক কারণ এখনও তদন্তাধীন। প্রাথমিকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে লরিতে থাকা সিলিন্ডারগুলিতে বিস্ফোরণ ঘটল, কোনও সিলিন্ডারে আগে থেকে ত্রুটি ছিল কি না, নাকি অন্য কোনও কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল—তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহণের নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, সেই বিষয়গুলিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের আশুলিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে বিপুল সংখ্যক পোশাক কারখানা রয়েছে এবং বহু মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে একটি কারখানার কাছে এমন বিস্ফোরণ ঘটলে স্থানীয় কর্মী ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে গ্যাস সিলিন্ডার বা দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে দমকল বাহিনীর তৎপরতায় দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে চারটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে যোগ দিলেও পরে আরও ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। তবে শিল্পাঞ্চলের ব্যস্ত রাস্তার কারণে দমকলের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছতে কিছুটা সমস্যার মুখে পড়েছিল বলে পৃথক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলির পরিচয় শনাক্ত করার পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও চলছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চূড়ান্তভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য জানানো হবে।
সব মিলিয়ে, রবিবার সন্ধ্যার এই বিস্ফোরণ আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি লরিতে বিস্ফোরণের পর ভয়াবহ আগুনে এখনও পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। মৃতদের মধ্যে জয়নাব বেগমের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে, বাকিদের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।


