দিল্লির ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা **Special Intensive Revision (SIR)** ঘিরে নতুন করে আলোচনায় নির্বাচন কমিশন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর, প্রবীণ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আডবানী, নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধু, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কপিল সিব্বল, বিদেশসচিব বিক্রম মিসরি-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে এসআইআর সংক্রান্ত নোটিস পৌঁছেছে। তালিকায় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে শীর্ষ আমলা এবং সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের নাম থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এই নোটিস পাঠানোর অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া নয়। বরং ভোটার সংক্রান্ত নথিতে কোনও অসঙ্গতি বা পুরনো তথ্যের সঙ্গে মিল না থাকার কারণে যাচাইয়ের জন্য এই নোটিস দেওয়া হয়েছে।
রবিবার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশনের তরফে বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। কমিশন স্পষ্ট করেছে, এসআইআর নোটিস পাওয়া মানেই কোনও ভোটারের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, এমনটা নয়। কোনও ভোটারের দেওয়া তথ্য এবং পুরনো নির্বাচনী নথির মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা যাচাই করার জন্য নোটিস পাঠানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ভোটারকে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, যাচাই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে এই নোটিসকে দেখা উচিত নয়।
বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরের ক্ষেত্রেও মূল বিষয়টি ভোটার নথির সঙ্গে আগের এসআইআর-এর তথ্যের সংযোগ নিয়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জয়শংকর এবং তাঁর স্ত্রী কিয়োকো জয়শংকরকে ‘unmapped with last SIR’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের বর্তমান ভোটার সংক্রান্ত তথ্য ২০০২ সালের পূর্ববর্তী এসআইআর-এর নথির সঙ্গে সরাসরি ম্যাপ করা যায়নি। তাঁরা নয়াদিল্লি বিধানসভা কেন্দ্রের সুন্দরবাগ এলাকার ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত। এই তথ্য যাচাইয়ের জন্যই তাঁদের কাছে নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে জয়শংকরের ক্ষেত্রে বিষয়টি ইতিমধ্যেই সমাধানের পথে বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, জয়শংকর এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিষয় যাচাই করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পাওয়ার পর তথ্য নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে। ফলে তাঁদের নাম নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, তা যাচাইয়ের মাধ্যমে মেটানোর প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধুর ক্ষেত্রে নোটিসের কারণ আলাদা। তাঁর ভোটার নথিতে নামের পার্থক্য পাওয়া গিয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। তিনি এনুমারেশন ফর্মে ‘Dr S S Sandhu’ নাম ব্যবহার করলেও ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ‘Sukhbir Singh Sandhu’ হিসেবে রয়েছে। এই নামের অমিলের কারণেই তাঁকে নোটিস পাঠানোর জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর জমা দেওয়া তথ্য ও নথি যাচাই করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিব্বলের ক্ষেত্রেও পুরনো এসআইআর-এর তথ্যের সঙ্গে বর্তমান ভোটার তথ্যের ম্যাপিং নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিদেশসচিব বিক্রম মিসরির নামও একই ধরনের ‘no mapping’ বা পুরনো নথির সঙ্গে তথ্যের সংযোগ না থাকার কারণে নোটিসের তালিকায় এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধরনের নোটিস পেয়েছেন আরও কয়েকজন শীর্ষ সরকারি আধিকারিক।
এই তালিকায় প্রবীণ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আডবানীর নামও রয়েছে। তাঁর সঙ্গে তাঁর মেয়ে প্রতিভা এবং পুত্রবধূ গীতিকার নামও নোটিসের তালিকায় রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের বর্তমান ভোটার তথ্য ২০০২ সালের এসআইআর-এর নথির সঙ্গে ম্যাপ করা যায়নি বলে নোটিস পাঠানো হয়েছে। তবে আডবানীর ছেলে জয়ন্তের ক্ষেত্রে এই ম্যাপিং সম্পন্ন হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এছাড়াও প্রাক্তন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া, প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়, তাঁর স্ত্রী সুদেশ ধনকড়, প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মদন লোকুর, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম স্বামী এবং দিল্লির মন্ত্রী প্রবেশ সাহিব সিং-সহ আরও কয়েকজনের নাম এসআইআর সংক্রান্ত নোটিসের তালিকায় এসেছে। ফলে এই প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আরও বেড়েছে।
দিল্লির নির্বাচন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি এসআইআর প্রক্রিয়ায় মোট প্রায় **৩৩.১৩ লক্ষ ভোটারের ক্ষেত্রে নথিগত অসঙ্গতি** চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাঁদের নোটিস পাঠানো হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২০০২ সালের শেষ এসআইআর-এর ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান তথ্যের মিল না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম বা অন্যান্য পরিচয় সংক্রান্ত তথ্যেও অমিল পাওয়া গিয়েছে। এই ধরনের অসঙ্গতি দূর করতেই সংশ্লিষ্ট ভোটারদের কাছ থেকে নথি ও ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছে, কোনও ভোটারের নাম সরিয়ে দেওয়ার আগে তাঁকে নিজের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিক তা যাচাই করবেন। কোনও নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র নোটিস পাওয়ার ভিত্তিতে কোনও ভোটারের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
সঙ্গে আপত্তি ও যাচাইয়ের পর্যায়ও চলছে। সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। দিল্লির নির্বাচন দপ্তরের তরফে জানানো হয়েছে, নথি যাচাইয়ের পর যাঁদের তথ্য সঠিক বলে নিশ্চিত হবে, তাঁদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় রাখা হবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটির চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করছে নথি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিকদের সিদ্ধান্তের ওপর।
উল্লেখযোগ্যভাবে, মৃত ব্যক্তির নামও সংশোধন প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত হয়েছে। প্রয়াত অর্থনীতিবিদ বিবেক দেবরায়ের নামও ‘unmapped with last SIR’ হিসেবে তালিকায় উঠে আসে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি তাঁরা জানেন এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময় তাঁর নাম বাদ দেওয়া হবে। এর ফলে বোঝা যাচ্ছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় শুধু বর্তমান রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যক্তিদের তথ্য নয়, ভোটার তালিকার সামগ্রিক তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এস জয়শংকর, লালকৃষ্ণ আডবানী এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে এসআইআর নোটিস পৌঁছনো নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের মূল বক্তব্য হল—**নোটিস মানেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া নয়**। বর্তমান ও পুরনো নির্বাচনী নথির মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা যাচাই করাই এই নোটিসের উদ্দেশ্য। প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পর তথ্য যাচাই করা হবে এবং নিয়ম মেনে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হবে। তাই জয়শংকর বা অন্য কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে নোটিস জারি হওয়াকে সরাসরি ভোটাধিকার হারানোর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার অবকাশ নেই; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরই স্পষ্ট হবে।


