সকালের চা থেকে শুরু করে দুধ, দই, পনির কিংবা মিষ্টি—ভারতীয় রান্নাঘরে দুধের ব্যবহার অত্যন্ত বেশি। কিন্তু বাজার থেকে কেনা দুধে জল বা অন্য কোনও উপাদান মেশানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে অনেকেরই সন্দেহ থাকে। বিশেষ করে দুধে ভেজাল নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ সামনে আসে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাভাবিক প্রশ্ন—বাড়িতে বসেই কি বোঝা সম্ভব দুধ খাঁটি নাকি ভেজাল?
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে ভারতের **Food Safety and Standards Authority of India (FSSAI)**-এর DART বা **Detect Adulteration with Rapid Test** উদ্যোগে বাড়িতে করা যায় এমন বেশ কিছু প্রাথমিক পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও একাধিক দ্রুত পরীক্ষা রয়েছে।
### জলে মেশানো হয়েছে কি না বুঝবেন কীভাবে?
দুধে সবচেয়ে সাধারণ ভেজালের একটি হল অতিরিক্ত জল মেশানো। এর প্রাথমিক পরীক্ষা করতে একটি পরিষ্কার, মসৃণ ও ঢালু পৃষ্ঠ ব্যবহার করা যায়।
এক ফোঁটা দুধ ওই পৃষ্ঠে ফেলুন এবং সেটি কীভাবে গড়িয়ে যায়, তা লক্ষ্য করুন। FSSAI-এর DART নির্দেশিকা অনুযায়ী, তুলনামূলক খাঁটি দুধ ধীরে গড়ায় এবং পিছনে সাদা দাগ বা রেখা রেখে যেতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত জল মেশানো দুধ তুলনামূলক দ্রুত গড়িয়ে যেতে পারে এবং সাদা রেখা কম দেখা যেতে পারে।
তবে এই পরীক্ষা শুধুমাত্র প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে। দুধের গুণমান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ল্যাবরেটরি পরীক্ষা প্রয়োজন।
### দুধে স্টার্চ মেশানো হয়েছে কি?
কখনও কখনও দুধের ঘনত্ব বা চেহারা পরিবর্তনের জন্য স্টার্চ জাতীয় উপাদান ব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। FSSAI-এর DART পদ্ধতিতে আয়োডিন ব্যবহার করে স্টার্চের উপস্থিতি সম্পর্কে প্রাথমিক পরীক্ষা করা যায়।
দুধের নমুনায় নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আয়োডিন প্রয়োগের পর যদি নীল রং দেখা যায়, তাহলে স্টার্চ থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে। কিন্তু এই ধরনের রাসায়নিক পরীক্ষা বাড়িতে করার সময় সতর্ক থাকা জরুরি এবং পরীক্ষার উপকরণ ভুলভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
### ডিটারজেন্ট মেশানো দুধ চিনবেন কীভাবে?
দুধে ডিটারজেন্ট থাকার আশঙ্কা থাকলেও শুধুমাত্র ফেনা দেখে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক ফেনা তৈরি হলে সেটিকে সতর্কতার সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সাম্প্রতিক FSSAI-ভিত্তিক প্রতিবেদনে দুধের নমুনা নাড়াচাড়া করার পর অস্বাভাবিকভাবে বেশি ফেনা বা লেদার তৈরি হচ্ছে কি না, তা লক্ষ্য করার কথা বলা হয়েছে। ডিটারজেন্ট মেশানো থাকলে ফেনা তৈরির প্রবণতা বেশি হতে পারে।
তবে সাধারণ দুধও নাড়াচাড়া করলে কিছুটা ফেনা তৈরি করতে পারে। তাই শুধুমাত্র ফেনা দেখে দুধে ডিটারজেন্ট রয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
### ইউরিয়া মেশানো হয়েছে কি না?
দুধের ক্ষেত্রে ইউরিয়া ভেজালের কথাও FSSAI-এর সচেতনতা উপকরণে উল্লেখ রয়েছে। ইউরিয়া শনাক্ত করার জন্য FSSAI-এর DART পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে।
প্রকাশিত FSSAI-ভিত্তিক পরীক্ষার একটি পদ্ধতিতে দুধের নমুনার সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ সয়াবিন বা অড়হর ডালের গুঁড়ো ব্যবহার করে পরে লাল লিটমাস পেপার দিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা হয়। নীল রঙের পরিবর্তন ইউরিয়ার উপস্থিতির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে এই ধরনের পরীক্ষা করার আগে পদ্ধতি ভালোভাবে জানা জরুরি। ভুল পদ্ধতিতে পরীক্ষা করলে ভুল ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
### শুধু দেখে কি দুধের ভেজাল বোঝা যায়?
দুধের রং, গন্ধ, স্বাদ কিংবা ঘনত্ব দেখে অনেক সময় সন্দেহ তৈরি হতে পারে। কিন্তু শুধু চোখে দেখে দুধ সম্পূর্ণ খাঁটি বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
একইভাবে ফ্রিজে রেখে দুধের আচরণ বা দুধ ফুটিয়ে কোনও নির্দিষ্ট পরিবর্তন হচ্ছে কি না—এই ধরনের প্রচলিত ঘরোয়া পদ্ধতিও সব ধরনের ভেজাল শনাক্ত করতে পারে না। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল কোনও ‘মিল্ক টেস্ট’ দেখেই সেটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে চূড়ান্ত পরীক্ষা ধরে নেওয়া উচিত নয়।
### FSSAI-এর DART কী?
খাদ্যে ভেজাল সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য FSSAI **DART—Detect Adulteration with Rapid Test** উদ্যোগ চালু করেছে। এর মাধ্যমে বাড়িতে সহজে করা যায় এমন বেশ কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
FSSAI-এর সরকারি DART প্ল্যাটফর্মে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য ছাড়াও তেল, মশলা, চিনি, খাদ্যশস্য, ফল-সবজি এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্যে ভেজাল শনাক্ত করার বিভিন্ন দ্রুত পরীক্ষার কথা রয়েছে।
অর্থাৎ, দুধের ক্ষেত্রে শুধু একটি পরীক্ষা নয়—কোন ধরনের ভেজালের সন্দেহ হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে আলাদা পদ্ধতি রয়েছে।
### প্যাকেটজাত দুধ কেনার সময় কী দেখবেন?
প্যাকেটজাত দুধ কিনলে শুধু ব্র্যান্ডের নাম দেখলেই হবে না। প্যাকেটের লেবেল, উৎপাদন ও ব্যবহারের তারিখ, সংরক্ষণের নির্দেশ এবং FSSAI লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্যও দেখে নেওয়া উচিত।
FSSAI দেশের খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা ও মান নির্ধারণ এবং খাদ্য ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় সংস্থা। তাই প্যাকেটজাত খাদ্য কেনার সময় সংশ্লিষ্ট খাদ্য ব্যবসার লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করাও সচেতন ক্রেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
### ঘরোয়া পরীক্ষা মানেই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ঘরোয়া পরীক্ষাগুলিকে **প্রাথমিক স্ক্রিনিং টুল** হিসেবে দেখা উচিত। কোনও পরীক্ষায় সন্দেহজনক ফল পাওয়া গেলেই সেটি শতভাগ ভেজাল প্রমাণ করে না।
দুধ নিয়ে গুরুতর সন্দেহ থাকলে সেই দুধ না খেয়ে নমুনাটি যথাযথ খাদ্য পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করানোই বেশি নির্ভরযোগ্য। FSSAI-ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অনুমোদিত খাদ্য পরীক্ষাগারের মাধ্যমে পরীক্ষার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়।
### দুধ কেনার ক্ষেত্রে সচেতন থাকুন
প্রতিদিনের খাবারের অংশ হওয়ায় দুধের মান নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি। খুব কম দামে পাওয়া যাচ্ছে বলেই কোনও দুধ ভালো বা খারাপ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা বা প্রতিষ্ঠিত উৎস থেকে দুধ কেনা, প্যাকেটের তথ্য পরীক্ষা করা এবং সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, **দুধের এক ফোঁটা দেখে তার সম্পূর্ণ বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।** FSSAI-এর DART-এর মতো প্রাথমিক পরীক্ষাগুলি ভেজালের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করতে সাহায্য করতে পারে। সন্দেহ থাকলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ হল পেশাদার খাদ্য পরীক্ষার সাহায্য নেওয়া।


