অপেক্ষার অবসান। ভারতের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের জন্য শক্তিশালী দল ঘোষণা করল ব্রাজিল। কোচ কার্লো আনচেলত্তি ঘোষিত ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, বার্সেলোনার রাফিনহা, রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ তারকা এন্দ্রিক, পিএসজি-র অধিনায়ক মারকিনিয়োস এবং আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস। ফলে ৩ অক্টোবর কলকাতার সল্টলেকের বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে বড় খবর নিঃসন্দেহে ভিনিসিয়ুস ও রাফিনহার উপস্থিতি। বিশ্বফুটবলের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের দুই তারকাকে সরাসরি কলকাতার মাঠে দেখার সুযোগ পেতে চলেছেন সমর্থকরা।
২৬ জনের স্কোয়াডে তারকার ছড়াছড়ি
অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের বিরুদ্ধে আসন্ন দুই আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের জন্য মোট ২৬ জনকে দলে রেখেছেন আনচেলত্তি। দলে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রয়েছে একাধিক তরুণ মুখ। বিশ্বকাপের পর ব্রাজিলের নতুন চক্রে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে এই দল নির্বাচনে।
আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনহা এবং এন্দ্রিকের পাশাপাশি রয়েছেন রায়ান, জোয়াও পেদ্রো এবং এস্তেভাও উইলিয়ান। ফলে ভারতের রক্ষণভাগের সামনে বিশ্বের অন্যতম প্রতিভাবান আক্রমণভাগকে সামলানোর বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
মাঝমাঠেও রয়েছে তারকার উপস্থিতি। ব্রুনো গিমারায়েস-এর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে রাখা হয়েছে দলে। রক্ষণে রয়েছেন মারকিনিয়োস এবং গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের মতো পরিচিত নাম।
ভিনিসিয়ুসকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা
ব্রাজিলের দল ঘোষণার পর ভারতীয় সমর্থকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরওয়ার্ড বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত।
ড্রিবলিং, গতি, একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এবং গোল করার দক্ষতার কারণে ভিনিসিয়ুসকে ঘিরে কলকাতার ম্যাচে বিশেষ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তাঁকে ভারতের মাঠে সরাসরি দেখার সুযোগ ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বড় আকর্ষণ। ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে তাঁর নাম থাকায় ম্যাচের টিকিট, সম্প্রচার এবং স্টেডিয়ামে দর্শক উপস্থিতি—সব ক্ষেত্রেই আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
রাফিনহাও থাকছেন
ভিনিসিয়ুসের পাশাপাশি ব্রাজিলের আক্রমণভাগের আরেক বড় নাম রাফিনহা। বার্সেলোনার এই তারকা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ব্রাজিলের আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ডান প্রান্ত থেকে আক্রমণ তৈরি করা, দ্রুত বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং গোলের সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা রাফিনহার অন্যতম শক্তি। ফলে ভারতের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের আক্রমণভাগ যে যথেষ্ট শক্তিশালী হতে চলেছে, তা দল ঘোষণার পরই পরিষ্কার।
ভারতের ডিফেন্সের সামনে তাই শুধু একজন তারকাকে নয়, একসঙ্গে একাধিক বিশ্বমানের ফরওয়ার্ডকে সামলানোর চ্যালেঞ্জ থাকবে।
এন্দ্রিকও কলকাতায়!
রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ ব্রাজিলিয়ান তারকা এন্দ্রিক-এর নামও রয়েছে স্কোয়াডে। বিশ্বফুটবলে তাঁকে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ তারকাদের অন্যতম হিসেবে দেখা হয়।
বিশ্বকাপ-পরবর্তী নতুন ব্রাজিল দলে তরুণ প্রতিভাদের বেশি সুযোগ দেওয়ার যে পরিকল্পনা আনচেলত্তি করেছেন, এন্দ্রিক তার অন্যতম উদাহরণ। ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে তিনি মাঠে নামবেন কি না, তা অবশ্য ম্যাচের পরিস্থিতি এবং কোচের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
তবে কলকাতার দর্শকদের সামনে এন্দ্রিককে দেখার সম্ভাবনাই ম্যাচটির আকর্ষণ অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।
রক্ষণেও বিশ্বমানের তারকা
শুধু আক্রমণ নয়, ব্রাজিলের রক্ষণভাগেও রয়েছে একাধিক বড় নাম। পিএসজি-র অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার মারকিনিয়োস এবং আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস দলে রয়েছেন।
মারকিনিয়োস দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁর নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ব্রাজিলের নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসও ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফলে ভারতের আক্রমণভাগের সামনে এই দুই ডিফেন্ডারের উপস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্বকাপের পর নতুন ব্রাজিল
২০২৬ বিশ্বকাপের পর ব্রাজিল দলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন আনচেলত্তি। নতুন চক্রে প্রবেশের প্রথম দলেই তার প্রভাব স্পষ্ট।
এই ২৬ জনের স্কোয়াডে আটজন নতুন মুখ রয়েছেন বলে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। একইসঙ্গে বিশ্বকাপের দল থেকে মাত্র কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে রেখে নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
দলের গড় বয়সও আগের তুলনায় কমেছে। অর্থাৎ ২০২৮ কোপা আমেরিকা এবং ২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আনচেলত্তি ধীরে ধীরে নতুন ব্রাজিল তৈরি করতে চাইছেন।
ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম সিনিয়র আন্তর্জাতিক ম্যাচ
ভারত ও ব্রাজিলের সিনিয়র জাতীয় দলের মুখোমুখি হওয়া নিজেই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ৩ অক্টোবর কলকাতায় আয়োজিত এই ম্যাচটি দুই দেশের সিনিয়র জাতীয় দলের প্রথম আন্তর্জাতিক মুখোমুখি লড়াই হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রাজিল বরাবরই অত্যন্ত জনপ্রিয়। পেলে থেকে রোনালদো, রোনালদিনহো থেকে নেইমার—ব্রাজিলের তারকাদের নিয়ে ভারতের ফুটবল সংস্কৃতিতে আলাদা আবেগ রয়েছে।
এবার সেই ব্রাজিলের বর্তমান প্রজন্মের তারকারাই কলকাতার মাঠে খেলতে আসছেন। ফলে ম্যাচটির গুরুত্ব শুধু একটি প্রীতি ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
৩ অক্টোবর কলকাতায় বড় ফুটবল উৎসব
ভারত-ব্রাজিল ম্যাচ হবে ৩ অক্টোবর, কলকাতার বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। এর আগে ব্রাজিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ২৫ এবং ২৯ সেপ্টেম্বর দুটি ম্যাচ খেলবে। এরপর এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে ভারতে আসবে ব্রাজিল দল।
অর্থাৎ কলকাতায় আসার আগে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফিটনেস ও নতুন কোচিং পরিকল্পনা নিয়ে কিছুটা পরীক্ষা হয়ে যাবে। ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে আনচেলত্তি সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন।
ভারতের সামনে কতটা কঠিন পরীক্ষা?
ব্রাজিলের স্কোয়াডের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ভারতের সামনে অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। বিশ্বফুটবলের অন্যতম সেরা দলটির বিরুদ্ধে ভারতকে শুধু রক্ষণ সামলালেই হবে না, বল দখল এবং পালটা আক্রমণেও নিজেদের সামর্থ্য দেখাতে হবে।
তবে প্রীতি ম্যাচ হওয়ায় দুই দলের কৌশল প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের মতোই হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্রাজিলের কোচ নতুন খেলোয়াড়দের পরীক্ষা করতে পারেন এবং একাধিক পরিবর্তনও হতে পারে।
ভারতের জন্য তাই এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় মূল্য হতে পারে বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরের অভিজ্ঞতা অর্জন।
নেইমার নেই, তবু তারকার অভাব নেই
ব্রাজিলের স্কোয়াড ঘোষণার পর একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—নেইমার কোথায়?
এই দলে নেইমারের নাম নেই। ফলে ব্রাজিলের অন্যতম পরিচিত মুখকে কলকাতায় দেখা যাবে না। তবে তাঁর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ভিনিসিয়ুস, রাফিনহা, এন্দ্রিক, মারকিনিয়োস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস, এস্তেভাও এবং জোয়াও পেদ্রোর মতো একাধিক তারকা দলে থাকায় ব্রাজিলের স্কোয়াডের আকর্ষণ মোটেও কমেনি।
বরং নেইমার-পরবর্তী যুগে ব্রাজিল কীভাবে নতুন প্রজন্মকে সামনে রেখে দল তৈরি করছে, কলকাতার ম্যাচ সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
মাঠ তৈরিতেও বিশেষ প্রস্তুতি
ভারত-ব্রাজিল ম্যাচের গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে মাঠ প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মাঠের প্রস্তুতির জন্য বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে। মাঠের ঘাস ও খেলার পরিবেশ আন্তর্জাতিক মানের রাখাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থাৎ শুধু তারকা খেলোয়াড় পাঠানো নয়, ম্যাচের আয়োজন এবং মাঠের মান নিয়েও ব্রাজিল যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে।
কলকাতায় ভিনিসিয়ুসকে দেখার অপেক্ষা
সব মিলিয়ে ৩ অক্টোবরের ম্যাচ এখন থেকেই ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। ব্রাজিলের নতুন প্রজন্মের সঙ্গে অভিজ্ঞ তারকাদের মিশ্রণ এবং আনচেলত্তির কৌশল—দুটিই দেখার সুযোগ পাবেন কলকাতার দর্শকরা।
সবচেয়ে বড় কথা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনহা এবং এন্দ্রিককে একই ব্রাজিল দলে দেখে নেওয়ার সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই ম্যাচটির উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতীয় ফুটবলের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় মঞ্চ। ফল যাই হোক, বিশ্বফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে খেলার অভিজ্ঞতা ভারতীয় খেলোয়াড়দের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হতে চলেছে।


