পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নতুন রাজ্য কার্যনির্বাহী কমিটি ঘিরে বড় চমক। ২৬৩ সদস্যের এই কমিটিতে জায়গা পেলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী **শুভেন্দু অধিকারী** এবং তাঁর বাবা তথা প্রাক্তন তমলুকের সাংসদ **শিশির অধিকারী**। শুধু কমিটিতে জায়গা পাওয়াই নয়, দুই নেতার উপরই গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শুভেন্দুর হাতে থাকছে তমলুক সাংগঠনিক জেলার দায়িত্ব, আর শিশির অধিকারী দেখবেন কাঁথি সাংগঠনিক জেলা।
বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে বিজেপির এই নতুন সাংগঠনিক কাঠামো যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বিশেষ করে নন্দীগ্রাম এবং পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনীতিতে অধিকারী পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রভাবের কথা মাথায় রাখলে একই কমিটিতে বাবা-ছেলের উপস্থিতি আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
## ২৬৩ সদস্যের নতুন কমিটি
বুধবার পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নতুন রাজ্য কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে তৈরি এই কমিটিতে মোট **২৬৩ জন** রয়েছেন।
রাজ্যের মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ এবং দলের প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি নতুন কমিটিতে সংগঠনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুখকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে এই রাজ্য কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন প্রক্রিয়া ঝুলে ছিল। শমীক ভট্টাচার্য রাজ্য সভাপতি হওয়ার পর থেকেই নতুন সাংগঠনিক কাঠামোর অপেক্ষা ছিল। অবশেষে উপনির্বাচনের আগে সেই কমিটি ঘোষণা করা হল।
ফলে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার লক্ষ্যেই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
## তমলুকের দায়িত্ব শুভেন্দুর হাতে
নতুন কমিটিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে **তমলুক সাংগঠনিক জেলার দায়িত্ব** দেওয়া হয়েছে। তমলুক সাংগঠনিক জেলার মধ্যেই রয়েছে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র।
আগামী **৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন** হওয়ার কথা। ফলে এই দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নন্দীগ্রাম শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর জয় জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নন্দীগ্রামের সাংগঠনিক দায়িত্বও তাঁর হাতে থাকায় উপনির্বাচনের আগে তাৎপর্য আরও বেড়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নন্দীগ্রামের সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং উপনির্বাচনে বিজেপির ফল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুভেন্দুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগাতে চাইছে দল।
## কাঁথির দায়িত্ব শিশিরের হাতে
শুভেন্দুর পাশাপাশি তাঁর বাবা শিশির অধিকারীকেও নতুন রাজ্য কার্যনির্বাহী কমিটিতে রাখা হয়েছে। তাঁর দায়িত্ব পড়েছে **কাঁথি সাংগঠনিক জেলার** উপর।
কাঁথি দীর্ঘদিন ধরেই অধিকারী পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাবের অন্যতম কেন্দ্র। শিশির অধিকারী নিজে দীর্ঘদিন এই এলাকার সাংসদ ছিলেন। ফলে কাঁথির সংগঠনের দায়িত্ব তাঁর হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
অর্থাৎ পূর্ব মেদিনীপুরের দুই গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক অঞ্চলে একই পরিবারের দুই প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতাকে দায়িত্ব দিল বিজেপি।
## বাবা-ছেলের রাজনৈতিক সমীকরণ
একসময় অধিকারী পরিবার তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। পরে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক দলবদলের পর বাবা শিশির অধিকারীও বিজেপিতে যোগ দেন।
শুভেন্দু এখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। অন্যদিকে শিশির অধিকারী দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী এবং পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনীতিতে তাঁর নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে।
তাই বিজেপির নতুন রাজ্য কমিটিতে দু’জনকে একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়াকে শুধুমাত্র পারিবারিক উপস্থিতি হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছুটা আড়াল হয়ে যায়। বিশেষ করে পূর্ব মেদিনীপুরের সংগঠনকে শক্তিশালী করতে অধিকারী পরিবারের প্রভাবকে ব্যবহার করার কৌশলও এর মধ্যে থাকতে পারে।
## নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে বড় দায়িত্ব
নতুন কমিটি ঘোষণার সময়টিই এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর—দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হতে চলেছে। নন্দীগ্রামের দায়িত্ব সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাতে যাওয়ায় উপনির্বাচনের প্রস্তুতিতে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিজেপির কাছে নন্দীগ্রাম শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়। এই আসনটি বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। ফলে সেখানে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
## অন্য নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
শুধু অধিকারী পরিবারের সদস্যদের নয়, নতুন কমিটিতে বিজেপির একাধিক শীর্ষ নেতাকে সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী **সুকান্ত মজুমদার** পেয়েছেন দক্ষিণ দিনাজপুরের দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী **শান্তনু ঠাকুর** দেখবেন বনগাঁ। রাজ্যের মন্ত্রী **তাপস রায়**-এর হাতে উত্তর কলকাতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় দেখবেন বীরভূম, নিশীথ প্রামাণিকের দায়িত্বে থাকছে কোচবিহার এবং শঙ্কর ঘোষকে শিলিগুড়ির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আসানসোলের সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালকে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে রাজ্য বিজেপি কার্যত বিভিন্ন সাংগঠনিক জেলাকে নির্দিষ্ট শীর্ষ নেতার হাতে তুলে দিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি আরও কেন্দ্রীভূত করার পথে হাঁটছে।
## দিলীপ ঘোষের নাম না থাকায় জল্পনা
নতুন ২৬৩ সদস্যের কমিটিতে প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি **দিলীপ ঘোষের নাম না থাকা** রাজনৈতিক মহলে আলাদা করে আলোচনা তৈরি করেছে। একইভাবে সায়ন্তন বসু এবং রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও কমিটিতে নেই বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
দিলীপ ঘোষ দীর্ঘদিন বাংলায় বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন। ফলে এত বড় কমিটিতে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে দলের অন্দরে এবং রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে।
তবে কমিটিতে কোনও নেতার নাম না থাকার কারণ সম্পর্কে দল আনুষ্ঠানিকভাবে কী ব্যাখ্যা দেয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ব্যাখ্যাকে দলীয় সিদ্ধান্তের সরকারি কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
## পুরনো ও নতুনদের মধ্যে ভারসাম্যের চেষ্টা
নতুন কমিটিতে বিজেপির বর্তমান মন্ত্রী ও বিধায়কদের পাশাপাশি দলের পুরনো সংগঠকদেরও জায়গা দেওয়া হয়েছে।
মীনা দেবী পুরোহিত, শ্যামচাঁদ ঘোষ এবং রাজকমল পাঠকের মতো পুরনো বিজেপি নেতাদের নামও রয়েছে তালিকায়। ফলে নতুন নেতৃত্বের পাশাপাশি দলের পুরনো সংগঠকদেরও ধরে রেখে সাংগঠনিক ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে।
এটি বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের সংগঠনকেও দ্রুত নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
## সামনে আরও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর সংগঠনের সামনে একাধিক পরীক্ষা রয়েছে। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি উপনির্বাচন, পুরসভা নির্বাচন এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য দলকে প্রস্তুত করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে ২৬৩ সদস্যের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনকে বিজেপির সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিটি সাংগঠনিক জেলার দায়িত্ব নির্দিষ্ট নেতাদের হাতে তুলে দিয়ে মাঠপর্যায়ের কাজকে আরও সক্রিয় করার চেষ্টা স্পষ্ট।
## অধিকারী পরিবারের প্রভাব কি আরও বাড়ল?
শুভেন্দু ও শিশির—দু’জনের হাতে পূর্ব মেদিনীপুরের দুই গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক জেলার দায়িত্ব যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বিজেপির রাজ্য সংগঠনে অধিকারী পরিবারের প্রভাব কি আরও বাড়ল?
নিশ্চিতভাবে এমন সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বলা সম্ভব নয়। তবে তমলুক ও কাঁথি—দুই এলাকাতেই অধিকারী পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক উপস্থিতি রয়েছে। সেই স্থানীয় পরিচিতি ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ বিজেপির সামনে তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে শুভেন্দুকে তমলুকের দায়িত্ব দেওয়া রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
## এখন নজর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে
বিজেপির নতুন রাজ্য কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণার পর এখন নজর উপনির্বাচনের প্রস্তুতিতে। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারী এবং রেজিনগরে দলের অন্য নেতাদের সাংগঠনিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
একদিকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব, অন্যদিকে দলের সংগঠন—দুই দিক সামলাতে হবে মুখ্যমন্ত্রীকে। নতুন কমিটিতে তাঁকে নির্দিষ্ট সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়ার ফলে দলের ভিতরেও তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা আরও স্পষ্ট হল।
### বিজেপির নতুন সমীকরণ
সব মিলিয়ে, ২৬৩ সদস্যের নতুন রাজ্য কার্যনির্বাহী কমিটিতে শুভেন্দু অধিকারী ও শিশির অধিকারীর একসঙ্গে জায়গা পাওয়া নিঃসন্দেহে অন্যতম বড় চমক। তার সঙ্গে তমলুক ও কাঁথির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক জেলার দায়িত্বও তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
দিলীপ ঘোষের মতো পুরনো নেতাদের অনুপস্থিতি, নতুন মন্ত্রী-বিধায়কদের দায়িত্ব এবং অধিকারী পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা—সব মিলিয়ে বিজেপির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আগামী **৬ অক্টোবরের নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন** এই নতুন সংগঠন কতটা কার্যকর, তার প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে।


