দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) সম্প্রতি এক বৃহৎ অভিযানে দেশের অন্যতম বড় **সিন্থেটিক বা নকল দুধ তৈরির চক্রের** হদিশ পেয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, ডিটারজেন্ট পাউডার, পাম অয়েল, বিভিন্ন রাসায়নিক গুঁড়ো এবং নিম্নমানের উপাদান মিশিয়ে কৃত্রিম দুধ তৈরি করা হচ্ছিল। পরে সেই নকল দুধ আসল দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে সরবরাহ করা হতো। তদন্তকারী সংস্থার আশঙ্কা, গত কয়েক মাসে কোটি কোটি লিটার ভেজাল দুধ বাজারে পৌঁছে থাকতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এই চক্রের বিরুদ্ধে যৌথভাবে অভিযান চালায় মহারাষ্ট্র এফডিএ এবং পুলিশ। পুনে-সহ একাধিক জেলায় একযোগে তল্লাশি চালিয়ে বহু কারখানা ও গুদামে হানা দেওয়া হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক, দুধ তৈরির কাঁচামাল এবং নকল দুধ তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার হয়েছে। একইসঙ্গে একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং কোটি টাকার সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, এই সিন্থেটিক দুধ তৈরিতে ডিটারজেন্ট পাউডার, পাম অয়েল, নিম্নমানের কেমিক্যাল, মিল্ক পাউডার এবং অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হতো। এরপর নির্দিষ্ট অনুপাতে সেই কৃত্রিম দুধ আসল দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরো বাজারে পাঠানো হতো। সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে এই ভেজাল দুধ চেনা কার্যত অসম্ভব ছিল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ভেজাল দুধ দীর্ঘদিন পান করলে পেটের সংক্রমণ, লিভার ও কিডনির সমস্যা, খাদ্যে বিষক্রিয়া এবং শিশুদের শারীরিক বিকাশে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিটারজেন্ট ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই এই ঘটনাকে শুধুমাত্র খাদ্যে ভেজালের মামলা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এফডিএ কমিশনার তুকারাম মুন্ধের নেতৃত্বে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজ্যজুড়ে খাদ্যে ভেজাল বিরোধী বিশেষ অভিযান চলছে। শুধু নকল দুধ নয়, ভেজাল পনির, নিম্নমানের দুগ্ধজাত পণ্য এবং লাইসেন্স ছাড়া খাদ্য উৎপাদনের বিরুদ্ধেও কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের দাবি, খাদ্য নিরাপত্তা আইন আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, ভেজাল দুধের এই নেটওয়ার্কটি একাধিক জেলার সঙ্গে যুক্ত ছিল। উৎপাদনের পর বিভিন্ন পরিবহণ চক্রের মাধ্যমে তা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হতো। পুলিশ এখন এই চক্রের আর্থিক লেনদেন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে যুক্ত বড় ব্যবসায়ীদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছে।
এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, শুধুমাত্র বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড বা অনুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে দুধ কিনতে হবে। দুধের স্বাদ, গন্ধ বা রঙে অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে তা ব্যবহার না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। সন্দেহজনক খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ব্যবহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মহারাষ্ট্র সরকারের এই অভিযানের পর দেশের অন্যান্য রাজ্যেও খাদ্যে ভেজাল রোধে নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, সরবরাহ ব্যবস্থার ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তিও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


