দু’দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর শনিবার সকালে নদিয়ার হরিণঘাটায় একটি জলাশয় থেকে ৩৬ বছর বয়সি এক যুবকের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে খুন করে দেহ জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যদিও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মিলবে বলে তদন্তকারীদের বক্তব্য।
মৃত যুবকের নাম **রাজু দাস (৩৬)**। তিনি হরিণঘাটার বিরহী বাজার সংলগ্ন কালিতলা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি পান ও লটারির ব্যবসা করতেন এবং বিরহী সবজি মার্কেটে তাঁর একটি দোকান ছিল। পরিবারের দাবি, বৃহস্পতিবার রাত থেকে রাজুর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। সেদিন রাতেই শেষবার তাঁর দাদা তপন দাসের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তারপর থেকেই তাঁর মোবাইল বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিবারের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ হয়নি।
পরিবার প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কোনও কাজে বাইরে গিয়েছেন। কিন্তু রাত বাড়লেও তিনি বাড়ি না ফেরায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। শুক্রবার ভোর থেকে আত্মীয়-পরিজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার পাশাপাশি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখেন পরিবারের সদস্যরা। তবে কোথাও তাঁর কোনও স্পষ্ট হদিশ মেলেনি। স্থানীয়দের দাবি, বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে বিরহী বাজার এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিল। আবার কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাঁকে বাড়ির দিকেও যেতে দেখা গিয়েছিল। এরপর কী ঘটেছিল, তা এখনও রহস্যই রয়ে গেছে।
শনিবার সকালে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক সংলগ্ন একটি ফ্লাইওভারের পাশে থাকা জলাশয়ে কিছু ভাসতে দেখেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। প্রথমে বিষয়টি স্পষ্ট না হলেও কাছে গিয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন সেটি একটি মানুষের দেহ। সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। খবর পেয়ে রাজুর পরিবারের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। জামাকাপড় দেখে তাঁরা মৃতদেহটি রাজুর বলে শনাক্ত করেন।
পুলিশ জলাশয় থেকে দেহ উদ্ধার করার পর পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, মৃতদেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। বিশেষ করে মাথা ও মুখে গুরুতর ক্ষতচিহ্ন দেখে তাঁদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়। মৃতের দাদা তপন দাস বলেন, “ওকে মেরে দেওয়া হয়েছে। মাথায় ও মুখে আঘাতের দাগ রয়েছে। ওর এই মৃত্যু স্বাভাবিক হতে পারে না।” পরিবারের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে রাজুকে হত্যা করে দেহটি জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে যাতে ঘটনাটি অন্যভাবে দেখানো যায়।
ঘটনার খবর পেয়ে হরিণঘাটা থানার অন্তর্গত মোহনপুর কেন্দ্রের পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। প্রথমে মৃতদেহটি হরিণঘাটা গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য কল্যাণী জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল হাসপাতালের পুলিশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই রাজুর গত কয়েক দিনের গতিবিধি খতিয়ে দেখা শুরু করেছেন। তিনি কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, শেষবার কোথায় দেখা গিয়েছিল এবং তাঁর ব্যবসা বা ব্যক্তিগত জীবনে কোনও বিবাদের ঘটনা ছিল কি না, সেই সমস্ত দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সূত্র খোঁজার চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনায় বিরহী বাজার ও কালিতলা এলাকায় শোকের পাশাপাশি আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, বাড়ির এত কাছাকাছি একটি জলাশয়ে এমনভাবে দেহ উদ্ধার হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই দ্রুত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে এই মৃত্যুকে ঘিরে একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। এটি সত্যিই পরিকল্পিত খুন, নাকি অন্য কোনও পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছে—তার উত্তর মিলবে তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের পর। তবে পরিবারের অভিযোগ এবং দেহে থাকা আঘাতের চিহ্নের দাবি ঘিরে ঘটনাটি ইতিমধ্যেই নদিয়ার হরিণঘাটায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।


