উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গায় এমন এক বিয়ের ঘটনা সামনে এসেছে, যা শুনে কার্যত হতবাক স্থানীয়রা। অভিযোগ, নিজের স্ত্রীকেই ‘ভাইঝি’ পরিচয় দিয়ে এক অবিবাহিত যুবকের সঙ্গে তাঁর বিয়ের আয়োজন করেছিলেন এক ব্যক্তি। শুধু তাই নয়, বিয়ের সময় পাত্রীকে কন্যাসম্প্রদানও করেন তিনি নিজেই। বিয়ের পরদিনই অবশ্য গোটা ঘটনা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় পাত্রের। শেষপর্যন্ত স্থানীয়দের হস্তক্ষেপ এবং পুলিশের কাছে অভিযোগের পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে অভিযুক্ত স্বামী-স্ত্রীকে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনাটি দেগঙ্গার কলসুর এলাকার। ধৃতদের নাম রবীন মণ্ডল ও তাঁর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা মণ্ডল। তদন্তকারীদের দাবি, পাত্রপক্ষের কাছ থেকে টাকা, সোনা-গয়না এবং পরবর্তীতে খোরপোষের নামে অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যেই এমন পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত এখনও চলছে এবং অভিযোগগুলির সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
## ঘটকের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব
জানা গিয়েছে, কলসুরের এক অবিবাহিত ব্যক্তি ঘটকের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পান। ছবি দেখে তিনি ওই তরুণীকে বিয়ে করতে রাজি হন। এরপর পরিবারের তরফে বিয়ের আয়োজন করা হয়। মন্দিরে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার পরিকল্পনা হয়।
পাত্রের কাছে পাত্রীকে রবীনের ‘ভাইঝি’ হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছিল বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পাত্রপক্ষের কাছে রবীন ছিলেন পাত্রীটির আত্মীয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি কাকার ভূমিকাতেই ছিলেন বলে অভিযোগ।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার সময় কন্যাসম্প্রদানের দায়িত্বও নেন রবীন। সেই সময় উপস্থিত অন্যান্যদের কাছেও গোটা বিষয়টি স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু বিয়ের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
## বিয়ের পরই পাত্রের সন্দেহ
বিয়ের পর প্রিয়াঙ্কার কিছু আচরণ পাত্রের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে জানা গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য এবং কয়েকজন বাসিন্দাকে জানান। এরপর স্থানীয়ভাবে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
সেই বৈঠকে প্রিয়াঙ্কা ও রবীনের বক্তব্যে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। তাঁদের সম্পর্ক এবং পরিচয় নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠে। ধীরে ধীরে সামনে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অভিযোগ, যে ব্যক্তি বিয়েতে পাত্রীটির ‘কাকা’ হিসেবে কন্যাদান করেছিলেন, তিনিই আসলে ওই মহিলার স্বামী। অর্থাৎ পাত্রীর প্রকৃত পরিচয় গোপন করে তাঁকে অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে রবীনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানাজানি হতেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়।
## থানায় অভিযোগ, গ্রেপ্তার দু’জন
স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এরপর রবীন মণ্ডল এবং প্রিয়াঙ্কা মণ্ডলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। শনিবার দু’জনকেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তদন্তকারীদের দাবি, শুধু এই একটি ঘটনাই নয়, এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের অভিযোগ, প্রিয়াঙ্কাকে কখনও ‘ভাইঝি’, আবার কখনও ‘কন্যা’ পরিচয় দিয়ে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
পুলিশের দাবি, সেই ক্ষেত্রে কয়েক মাস সংসার করার পর নানা অজুহাতে বিচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি করা হত। এরপর পাত্রপক্ষের কাছ থেকে খোরপোষের নামে টাকা এবং সোনা-গয়না নেওয়া হত বলে অভিযোগ। জিজ্ঞাসাবাদে রবীন এ ধরনের ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের দাবি। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলিকে পুলিশের তদন্তাধীন অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
## আরও কতজন প্রতারিত? তদন্ত পুলিশের
এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও এখন পুলিশের তদন্তের অন্যতম বিষয়। বিশেষ করে যে ঘটকের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল, তাঁর ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, রবীন ও প্রিয়াঙ্কা একাই এই পরিকল্পনা করতেন, নাকি এর পিছনে আরও কোনও ব্যক্তি বা সংগঠিত চক্র কাজ করত। একই কৌশলে অতীতে আর কোনও ব্যক্তিকে বিয়ে করানো হয়েছিল কি না, সেই তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
যদি পুলিশের অভিযোগ সত্যি হয়, তাহলে এটি নিছক একটি বিয়ের ঘটনা নয়; বরং বিয়েকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত আর্থিক প্রতারণার অভিযোগও সামনে আসতে পারে। ফলে তদন্তের পর এই ঘটনার পরিধি আরও বড় হয় কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে।
## পাত্রপক্ষের টাকা-গয়না নেওয়ার অভিযোগ
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, পাত্রপক্ষের কাছ থেকে টাকা ও গয়না হাতানো এবং পরবর্তী সময়ে খোরপোষ আদায় করাই এই ধরনের প্রতারণার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে। তবে ঠিক কত টাকা বা কত পরিমাণ গয়না নেওয়া হয়েছে, তা এখনও তদন্তাধীন।
একইভাবে, অতীতে কতজন পাত্র এই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তারও কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও পুলিশের তরফে জানানো হয়নি। অভিযোগগুলি যাচাই করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ককে ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে আত্মীয় পরিচয়ে অন্য ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় দেগঙ্গার এই ঘটনা বিশেষভাবে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য—এই ঘটনার নেপথ্যে আসল উদ্দেশ্য কী ছিল, আর রবীন-প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত কি না। পুলিশি তদন্ত এগোলেই সেই প্রশ্নগুলির উত্তর মিলতে পারে।


