আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর প্রায় দু’বছর পর ফের নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হল। এবার তদন্তের কেন্দ্রে উঠে এসেছে মৃত চিকিৎসকের দেহ সৎকারের সময় পানিহাটি শ্মশানঘাটে ঠিক কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্ন। মৃত চিকিৎসকের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে খড়দহ থানায় নতুন করে এফআইআর দায়ের হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে দ্রুত দেহ সৎকারে চাপ দেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের মতো গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আরজি কর হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হওয়ার পর গোটা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। ঘটনাটির তদন্ত প্রথমে কলকাতা পুলিশের হাতে থাকলেও পরবর্তীতে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে তদন্তভার নেয় সিবিআই। ঘটনায় সঞ্জয় রায় নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীতে আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেয়। কিন্তু মৃত চিকিৎসকের পরিবারের দাবি, ঘটনার নেপথ্যে আরও কেউ যুক্ত থাকতে পারে। সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও সম্পূর্ণভাবে মেলেনি বলেই তাঁদের বক্তব্য।
### নতুন এফআইআরে কী অভিযোগ?
মৃত চিকিৎসকের বাবার দায়ের করা নতুন এফআইআরে পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ, পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সোমনাথ দে এবং সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদন সূত্রে জানা গিয়েছে।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব খাটানো হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে দ্রুত দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ তৈরি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। মৃত চিকিৎসকের বাবার দাবি, পরিবারের পক্ষ থেকে শেষশ্রদ্ধা জানানোর জন্য যে সময় প্রয়োজন ছিল, সেই সময়ও তাঁদের দেওয়া হয়নি। দ্রুত দাহ করার জন্য চাপ তৈরি হয়েছিল বলে তাঁর অভিযোগ।
তবে এই সমস্ত অভিযোগ এখনও তদন্তসাপেক্ষ। এফআইআরে কারও নাম থাকা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। তদন্তের পরই অভিযোগগুলির সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব।
### মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর পদক্ষেপ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত চিকিৎসকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পানিহাটিতে আয়োজিত একটি স্মরণ অনুষ্ঠানে শ্মশানঘাটের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য বারাকপুরের পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপরই খড়দহ থানায় নতুন করে এফআইআর দায়ের করেন মৃত চিকিৎসকের বাবা। অর্থাৎ, এতদিন ধরে আরজি কর কাণ্ডের মূল ঘটনা এবং তদন্ত নিয়ে যে প্রশ্নগুলি সামনে এসেছে, তার পাশাপাশি এবার সৎকারের সময়কার ঘটনাকেও আলাদা করে তদন্তের আওতায় আনার দাবি জোরালো হয়েছে।
### শ্মশানঘাটে কী ঘটেছিল?
মৃত চিকিৎসকের বাবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পানিহাটি শ্মশানঘাট। তাঁর দাবি, ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর দেহ দ্রুত সৎকারের জন্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত হিসেবে যাঁদের নাম এফআইআরে রয়েছে, তাঁরা দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে আসার ঘটনাও ঘটেছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, শেষবারের মতো মৃতাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময়ও তাঁরা পাননি।
এই অভিযোগগুলির সত্যতা যাচাই করাই এখন তদন্তকারী সংস্থার সামনে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শ্মশানঘাটে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট নথি, দেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এবং সৎকার সংক্রান্ত রেকর্ড—সবই তদন্তের অংশ হতে পারে।
### দাহ প্রক্রিয়া নিয়ে কেন প্রশ্ন?
কোনও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের পর মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, আরজি করের ঘটনায় সেই প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়েই এবার প্রশ্ন উঠছে।
মৃত চিকিৎসকের বাবা দাবি করেছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দেহ হস্তান্তর এবং দ্রুত সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নতুন এফআইআরে এই বিষয়গুলিই গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
তবে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সরকারি নথি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে।
### তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ
নতুন এফআইআরে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের মতো গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়েছে। কোনও অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্তকে প্রভাবিত করতে প্রমাণ নষ্ট বা পরিবর্তনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তদন্তকারীদের কাছে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই একটি বড় দায়িত্ব।
যদি সত্যিই কোনও প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে করা হয়েছিল, কারা সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কী ধরনের প্রমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
অন্যদিকে অভিযোগটি যদি প্রমাণিত না হয়, সেক্ষেত্রেও তদন্তের মাধ্যমে সেই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
### স্বাস্থ্যদপ্তরের আলাদা তদন্ত
শুধু পুলিশি তদন্ত নয়, ঘটনার দিন ঠিক কী হয়েছিল তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্যদপ্তরের পক্ষ থেকেও নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই তদন্তের রিপোর্ট মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এর ফলে আরজি কর কাণ্ডের সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহকে বিভিন্ন দিক থেকে পুনরায় খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত, সেখান থেকে দেহ হস্তান্তর এবং পরবর্তীতে শ্মশানে সৎকার—পুরো প্রক্রিয়াটিই এবার তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
### সিবিআই তদন্ত নিয়েও পরিবারের প্রশ্ন
আরজি কর কাণ্ডের তদন্তভার নেওয়ার পর সিবিআই মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু মৃত চিকিৎসকের বাবা-মা শুরু থেকেই দাবি করে এসেছেন, এই ঘটনায় আরও ব্যক্তির ভূমিকা থাকতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে পরিবারের অসন্তোষও রয়েছে। নতুন করে তদন্তের প্রক্রিয়ায় আগের তদন্তকারী আধিকারিকের পরিবর্তে নতুন আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে মূল ঘটনার পাশাপাশি সৎকারের সময়কার ঘটনাগুলি নিয়েও তদন্ত শুরু হওয়া পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
### পরিবারের দাবির সঙ্গে নতুন তদন্তের যোগসূত্র
মৃত চিকিৎসকের পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবি হল, ৯ আগস্টের রাতে আসলে কী ঘটেছিল এবং কারা এই ঘটনায় যুক্ত ছিলেন, তা সম্পূর্ণভাবে সামনে আসা উচিত। সেই সঙ্গে তদন্তের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার দাবিও তাঁরা করে আসছেন।
এবার শ্মশানঘাটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন এফআইআর সেই বৃহত্তর তদন্তেরই একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দেহ সৎকারের আগে কী কী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল, পরিবারের সম্মতি কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং কারা সেই সময় উপস্থিত ছিলেন—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
### সামনে বড় প্রশ্ন
নতুন এফআইআর দায়ের হওয়ার পর এখন তদন্তের গতিপথের দিকে নজর থাকবে। অভিযোগে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের বক্তব্য কী, ঘটনাস্থলে তাঁরা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে সরকারি নথিপত্রের কতটা মিল রয়েছে—এসব বিষয় তদন্তে স্পষ্ট হতে পারে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যদপ্তরের তদন্ত রিপোর্টও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ ঘটনার দিন হাসপাতাল থেকে শুরু করে সৎকার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশাসনিক তথ্য সামনে আসতে পারে সেই রিপোর্টে।
সব মিলিয়ে, আরজি কর কাণ্ডে নতুন এফআইআর ফের একবার পুরনো ঘটনাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এবার মূল প্রশ্ন শুধু আরজি করের সেমিনার হলে কী ঘটেছিল তা নয়, বরং ময়নাতদন্তের পর তরুণী চিকিৎসকের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া এবং পানিহাটি শ্মশানঘাটে সৎকারের সময় কোনও অনিয়ম হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। মৃত চিকিৎসকের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া এফআইআরে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলি এখনও তদন্তাধীন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশি তদন্ত, স্বাস্থ্যদপ্তরের রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ভিত্তিতেই প্রকৃত সত্য সামনে আসতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে আরজি কর কাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসা পরিবারের কাছে এই নতুন তদন্ত তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


