মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও আমেরিকার সংঘাত ফের বড়সড় উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে। মার্কিন বাহিনীর হাতে ইরানের একাধিক তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস বা অচল হওয়ার পর এবার সরাসরি ওয়াশিংটনকে কড়া হুঁশিয়ারি দিল তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ জানিয়েছেন, আমেরিকাকে বুঝতে হবে যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ‘নিয়ম’ বদলে গিয়েছে। ভবিষ্যতে ইরানের স্বার্থ বা নিরাপত্তার উপর হামলা হলে তার জবাব আরও দ্রুত, শক্তিশালী এবং ভয়াবহ হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
গালিবাফের এই বক্তব্য এসেছে মার্কিন বাহিনীর ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার পর। ফলে দুই দেশের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
### তিন ইরানি ট্যাঙ্কারে মার্কিন হামলা
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার মার্কিন বাহিনী ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্য করে অভিযান চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC-এর হামলার পরেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। খার্গ দ্বীপের কাছে ‘M/T Downey’, জাস্কের কাছে ‘M/T Stark 1’ এবং ওমান উপসাগরে ‘M/T Kylo’ নামে একটি জাহাজকে লক্ষ্য করা হয়। মার্কিন পক্ষের বক্তব্য, তৃতীয় জাহাজটি ‘Noxen’ নামেও পরিচিত ছিল।
মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, অভিযানের আগে জাহাজগুলির নাবিক ও কর্মীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওয়াশিংটনের দাবি, এই জাহাজগুলি IRGC-কে অর্থ জোগানোর একটি গোপন তেল পরিবহণ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন হামলাকে আগ্রাসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
### ‘আরও দ্রুত এবং আরও যন্ত্রণাদায়ক জবাব’
এই পরিস্থিতিতেই কড়া বার্তা দিয়েছেন গালিবাফ। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, এখন থেকে ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কোনও হামলা হলে আগের তুলনায় আরও দ্রুত এবং শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাবে তেহরান। তিনি আমেরিকাকে ‘দেরি হওয়ার আগেই’ সংঘাতের পরিবর্তিত বাস্তবতা বুঝে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
ইরানের এই বক্তব্যকে শুধু কূটনৈতিক হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। কারণ, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ ক্রমশ বেড়েছে। ফলে নতুন করে কোনও হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়া আরও বড় আকার নিতে পারে।
### হরমুজ প্রণালী নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান-আমেরিকা সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহণ হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে ইতিমধ্যেই ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ইরানের তেল রফতানি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
### পাল্টা হামলার আশঙ্কা
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ভবিষ্যতে আমেরিকার হামলার বিরুদ্ধে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর কথা জানিয়েছে। একই সময়ে তেহরান অর্থনৈতিক সমস্যার মোকাবিলার জন্যও নতুন পদক্ষেপের কথা বলছে। অর্থাৎ সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ইরানের উপর থাকা অর্থনৈতিক চাপও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক—দুই ধরনের চাপ বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। ফলে আপাতত দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমার বদলে আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
### শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়াবে সংঘাত?
ইরানের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারির পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমেরিকা এবার কী পদক্ষেপ নেয়। পাল্টা সামরিক হামলা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। আবার কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস এবং সামরিক সংঘাত সেই পথকে কঠিন করে তুলছে।
সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেট্টাও সম্প্রতি সতর্ক করেছেন যে ইরান-আমেরিকার সংঘাত আরও কয়েক মাস চলতে পারে। তাঁর মতে, সংঘাতের অবসানের স্পষ্ট পথ এখনও দেখা যাচ্ছে না।
ফলে ইরানের ‘যুদ্ধের নিয়ম বদলে গিয়েছে’ বার্তা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন নজরে। একটি নতুন মার্কিন হামলা কিংবা ইরানের পাল্টা আঘাত পুরো সংঘাতকে আরও বড় আঞ্চলিক সংকটে পরিণত করতে পারে।


