নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মাঝেই কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ঐক্যের বার্তা দেওয়া হয়েছে। শনিবার ফুলবেঞ্চ বৈঠকের পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার—বিবেক জোশী ও সুখবীর সিং সান্ধু—একসঙ্গে একটি ছবিতে ধরা দেন। পাশাপাশি কমিশনের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, সাম্প্রতিক এসআইআর (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসহ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলি সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমন দাবি সামনে আসে যে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে মতানৈক্য রয়েছে। বিশেষ করে এসআইআর, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ পরিচালনা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। সেই জল্পনার মধ্যেই শনিবারের বৈঠককে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
### একফ্রেমে তিন কমিশনার
শনিবার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন তিন কমিশনার। বৈঠক শেষে কমিশনের পক্ষ থেকে তিনজনের একসঙ্গে তোলা একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ছবির মাধ্যমে কমিশন স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে কোনও ভাঙন নেই এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা ঐক্যবদ্ধ।
### এসআইআর নিয়ে কমিশনের ব্যাখ্যা
বিবৃতিতে কমিশন জানায়, এসআইআর কর্মসূচি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোনও মতপার্থক্য ছিল না। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিহার দিয়ে শুরু হওয়া এবং পরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সম্প্রসারিত এই কর্মসূচির সিদ্ধান্ত ২০২৫ সালের ২৪ জুন সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল।
কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকা আরও নির্ভুল ও হালনাগাদ করার উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল এবং এতে তিন কমিশনারই একমত ছিলেন।
### চিঠি নিয়ে কী বলল কমিশন?
বিতর্কের অন্যতম কারণ ছিল দুই নির্বাচন কমিশনারের লেখা একটি চিঠি। বিভিন্ন মহলে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ওই চিঠিতে কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং সফটওয়্যার পরিচালনা নিয়ে গুরুতর আপত্তি জানানো হয়েছে।
তবে শনিবারের বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন জানায়, ওই চিঠির মূল বিষয় ছিল কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং কমিশনে ডেপুটেশনে থাকা এক আধিকারিকের দায়িত্ব বণ্টন সংক্রান্ত প্রশাসনিক বিষয়। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের কাজের বণ্টন কার্যকর হয়নি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ওপর ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের তদারকি প্রত্যাহারও করা হয়নি।
### বিতর্কের সূত্রপাত
এই গোটা বিতর্কের সূত্রপাত হয় ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের পর। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, গত দশ মাসে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অন্তত ১৪টি সিদ্ধান্তে দুই নির্বাচন কমিশনার লিখিত আপত্তি তুলেছিলেন। প্রতিবেদনে এসআইআর, ভোটার অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতবিরোধের কথাও উল্লেখ করা হয়।
এরপরই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি বিষয়টি নিয়ে সরব হয় এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। শনিবার প্রকাশিত ছবি ও সরকারি বিবৃতিকে বিরোধীদের একাংশ “ড্যামেজ কন্ট্রোল” বলেও অভিহিত করেছে।
### রাজনৈতিক তাৎপর্য
নির্বাচন কমিশন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই কমিশনের অভ্যন্তরে মতবিরোধের খবর প্রকাশ্যে আসা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। আসন্ন বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে কমিশনের পক্ষ থেকে ঐক্যের বার্তা দেওয়াকে অনেকেই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
তবে একই সঙ্গে বিরোধী শিবিরের প্রশ্নও পুরোপুরি থেমে যায়নি। তাদের দাবি, কমিশনের বিবৃতি ও প্রকাশিত ছবি বিতর্কের অবসান ঘটানোর চেষ্টা হলেও, পূর্বে ওঠা অভিযোগগুলির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনও জনসমক্ষে আসেনি। অন্যদিকে কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট—গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি সম্মিলিতভাবে নেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনও নীতিগত বিভাজন নেই।


