পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কৃষিকে আরও আধুনিক করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ঘোষণা করলেন রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী **দিলীপ ঘোষ**। নদিয়ার কল্যাণীতে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত রাজ্যস্তরের কাঁঠাল প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি কৃষি, বীজ উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং কৃষিপণ্যের রপ্তানি নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
দিলীপ ঘোষ জানান, রাজ্যের কৃষকদের উন্নত মানের বীজ সহজলভ্য করার জন্য প্রায় **₹১০০ কোটি টাকার বিশেষ প্রকল্প** হাতে নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় আম, আলু এবং পাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উন্নত বীজ উৎপাদনের জন্য পৃথক ইউনিট গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি আলুর ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য আধুনিক গবেষণাগার এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি গবেষণার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাঁর মতে, উন্নত বীজের ব্যবহার বাড়লে উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি কৃষকদের লাভও বাড়বে।
মন্ত্রী আরও বলেন, শুধুমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই হবে না, কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক বাজারও নিশ্চিত করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় **নতুন ফুড পার্ক** গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই ফুড পার্কগুলিতে ফল, সবজি এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং এবং মূল্য সংযোজনের ব্যবস্থা থাকবে। এর ফলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগও বাড়বে বলে সরকারের আশা।
দিলীপ ঘোষ জানান, বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ফল ও সবজি সংগ্রহের ব্যবস্থাও করা হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমে কৃষকরা উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশ-বিদেশের বাজারে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।
অনুষ্ঠানে কাঁঠাল চাষের সম্ভাবনার কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গে কাঁঠাল উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ এবং উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্য—যেমন চিপস, ভেগান মিট, কাবাব এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্য—তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব। এতে কৃষকদের আয়ের নতুন পথ খুলে যেতে পারে।
এছাড়াও, তিনি বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও শক্তিশালী গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। কৃষি গবেষণা, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং উন্নত চাষপদ্ধতির মাধ্যমে কৃষকদের কাছে আধুনিক কৃষি জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে যাতে গবেষণার সুফল সরাসরি মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়।
কৃষি সংক্রান্ত ঘোষণার পাশাপাশি পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেন দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, বিভিন্ন পঞ্চায়েতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। সেই অভিযোগগুলির তদন্তে বিশেষ অডিট শুরু হয়েছে। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত বীজ উৎপাদন, ফুড পার্ক নির্মাণ, কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াকরণ এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মতো উদ্যোগগুলি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে এই প্রকল্পগুলির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর। পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সহজ ঋণ সুবিধাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
সব মিলিয়ে, দিলীপ ঘোষের ঘোষিত নতুন কৃষি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হল পশ্চিমবঙ্গের কৃষিকে আধুনিক, লাভজনক এবং রপ্তানিমুখী করে তোলা। উন্নত বীজ, আধুনিক গবেষণা, ফুড পার্ক, সরাসরি বিপণন এবং কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটানোই সরকারের উদ্দেশ্য। এখন এই ঘোষণাগুলি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং মাঠপর্যায়ে কৃষকরা কতটা উপকৃত হন, সেদিকেই নজর থাকবে।


