কলকাতা ডার্বি মানেই শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়, বরং আবেগ, কৌশল, গ্যালারির উন্মাদনা এবং দুই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের মর্যাদার লড়াই। এবারের ডার্বিতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। টানটান উত্তেজনার ম্যাচে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এক গোলে জয় পেলেও ম্যাচ শেষে দুই দলের কোচের প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠল সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা।
ইস্টবেঙ্গলের প্রধান কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস ম্যাচের ফল নিয়ে হতাশ হলেও দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ফুটবলে সব সময় ফলাফলই একটি ম্যাচের প্রকৃত ছবি তুলে ধরে না। খেলোয়াড়রা পরিকল্পনা অনুযায়ী মাঠে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন এবং আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক দিক ছিল।
হাবাস বলেন, নতুন মৌসুমের শুরুতে দল এখনও নিজেদের সেরা ছন্দে পৌঁছায়নি। বেশ কয়েকজন ফুটবলার নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন এবং দলগত বোঝাপড়াও ধীরে ধীরে আরও উন্নত হবে। তাঁর বিশ্বাস, এই ধরনের ম্যাচ থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে ইস্টবেঙ্গল।
অন্যদিকে, জয় পেলেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন মোহনবাগানের প্রধান কোচ প্যানাজিওটিস ডিলমপেরিস। তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয় অবশ্যই আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, তবে এখনও দলের শারীরিক সক্ষমতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দীর্ঘ মৌসুমের কথা মাথায় রেখে ফুটবলারদের ফিটনেস আরও উন্নত করা জরুরি।
তিনি জানান, ডার্বির মতো উচ্চ-তীব্রতার ম্যাচে ফুটবলারদের দৌড়, প্রেসিং এবং শেষ পর্যন্ত একই গতিতে খেলার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকজন ফুটবলার ভালো খেললেও ম্যাচের শেষভাগে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল। তাই আগামী অনুশীলনে ফিটনেস এবং রিকভারি নিয়েই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ম্যাচে দুই দলই একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিল। ইস্টবেঙ্গল আক্রমণে আগ্রাসী ফুটবল খেললেও শেষ মুহূর্তে গোলের সামনে কার্যকারিতার অভাব দেখা যায়। অন্যদিকে মোহনবাগান সুযোগ কাজে লাগিয়ে মূল্যবান গোল তুলে নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধানই জয়ের জন্য যথেষ্ট হয়।
ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কোচদের অধীনে দুই দলই এখনও নিজেদের সেরা কম্বিনেশন খুঁজছে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই এই ডার্বি দুই কোচকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। কোথায় উন্নতির প্রয়োজন এবং কোন বিভাগে বাড়তি কাজ করতে হবে, সেই ধারণাও স্পষ্ট হয়েছে।
ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে দলের লড়াকু মানসিকতা ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। পরাজয়ের পরেও খেলোয়াড়দের লড়াই করার মানসিকতা এবং বল দখলে রাখার চেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী করছে সমর্থকদের। অন্যদিকে মোহনবাগান শিবিরে জয়ের আনন্দ থাকলেও কোচের ফিটনেস নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দেওয়া স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে দল এখনও পূর্ণ প্রস্তুত নয়।
ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম বড় এই দ্বৈরথ আবারও প্রমাণ করল, ডার্বি শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি দুই দলের মানসিক শক্তি, কৌশল এবং প্রস্তুতিরও পরীক্ষা। জয়-পরাজয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে দুই কোচের মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, মৌসুম এখনও অনেক বাকি এবং দুই দলই নিজেদের আরও পরিণত রূপে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।
আগামী ম্যাচগুলিতে দুই ক্লাবের পারফরম্যান্সের দিকে এখন নজর থাকবে সমর্থকদের। ইস্টবেঙ্গল হার থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে, আর মোহনবাগান জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি ফিটনেসের ঘাটতি কাটিয়ে আরও শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়েই এগোবে।


