ডুরান্ড কাপের সেমিফাইনালে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর ফাইনালে জায়গা করে নিল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট শিলংয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের ম্যাচ গোলশূন্যভাবে শেষ হয়। এরপর টাইব্রেকারে বাজিমাত করে সবুজ-মেরুন শিবির। পেনাল্টি শুটআউটে মোহনবাগান ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে দেয় নর্থইস্ট ইউনাইটেডকে। গোলরক্ষক বিশাল কাইথের দুরন্ত পারফরম্যান্স ফের মোহনবাগানের জয়ের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠল।
এই জয়ের ফলে ডুরান্ড কাপের ফাইনালে ফের দেখা হতে চলেছে কলকাতার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী—মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের। বুধবারই এসসি দিল্লিকে টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কেটেছিল লাল-হলুদ। ফলে ২৩ আগস্টের ফাইনাল ঘিরে ইতিমধ্যেই উত্তেজনা তুঙ্গে।
## গোলশূন্য ৯০ মিনিট, তারপর পেনাল্টির পরীক্ষা
শিলংয়ের ম্যাচে দুই দলই একাধিকবার আক্রমণে উঠলেও নির্ধারিত সময়ে গোলের মুখ খুলতে পারেনি। নর্থইস্ট ইউনাইটেড নিজেদের মাঠের পরিবেশের সুবিধা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে, অন্যদিকে মোহনবাগানও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনও দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের জালে বল জড়াতে পারেনি। ফলে ম্যাচ সরাসরি টাইব্রেকারে গড়ায়।
ডুরান্ড কাপের নকআউট পর্বে অতিরিক্ত সময়ের বদলে সরাসরি পেনাল্টি শুটআউটের নিয়ম রয়েছে। তাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব গিয়ে পড়ে দুই দলের গোলরক্ষক এবং পেনাল্টি টেকারদের উপর।
## ফের নায়ক বিশাল কাইথ
মোহনবাগানের জয়ের অন্যতম বড় কারণ গোলরক্ষক বিশাল কাইথ। চাপের মুহূর্তে তাঁর সেভ দলকে ফাইনালে পৌঁছে দেয়। মোহনবাগানের গোলরক্ষক ইতিমধ্যেই এই ডুরান্ড কাপে পেনাল্টি শুটআউটে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। জামশেদপুর এফসির বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে শেষ চারে তুলেছিলেন। সেই ম্যাচে দীর্ঘ টাইব্রেকারে মোহনবাগান ৯-৮ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল।
নর্থইস্টের বিরুদ্ধেও কাইথের উপস্থিতি মোহনবাগানের জন্য বড় ভরসা হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সবুজ-মেরুন সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটে এবং দল পৌঁছে যায় ফাইনালে।
## টানা দ্বিতীয় ম্যাচ পেনাল্টিতে জয়
মোহনবাগানের জন্য এবারের ডুরান্ড কাপের নকআউট পর্ব যেন পেনাল্টি শুটআউটের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে জামশেদপুরের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ে ১-১ ড্র হওয়ার পর ৯-৮ ব্যবধানে টাইব্রেকারে জয় পেয়েছিল সবুজ-মেরুন। এবার সেমিফাইনালেও ৯০ মিনিটে গোল না হওয়ায় ফের টাইব্রেকারের মুখোমুখি হতে হল তাদের।
তবে এবার ব্যবধান ছিল ৪-৩। অর্থাৎ টানা দুই নকআউট ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউট জিতে ফাইনালে পৌঁছে গেল মোহনবাগান।
## নর্থইস্টের বিরুদ্ধে কঠিন পরীক্ষা
ম্যাচের আগে নর্থইস্ট ইউনাইটেডকে নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক ছিল মোহনবাগান। কারণ, তারা ছিল গত দুই মরশুমের ডুরান্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন। কোয়ার্টার ফাইনালে শিলং লাজংয়ের বিরুদ্ধে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ৫-২ ব্যবধানে জিতেছিল নর্থইস্ট। সেই ম্যাচে মরক্কোর ফরোয়ার্ড আলাউদ্দিন আজারেই হ্যাটট্রিক করেছিলেন।
ফলে সেমিফাইনালে মোহনবাগানের সামনে কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ম্যাচে টাইব্রেকারই পার্থক্য গড়ে দিল।
## নর্থইস্টের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের পর সেমিফাইনাল
সেমিফাইনালের আগে নর্থইস্ট ইউনাইটেড শিলং লাজংয়ের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমার্ধ শেষে ২-১ গোলে পিছিয়ে ছিল তারা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে একের পর এক গোল করে ম্যাচের রং বদলে দেয় নর্থইস্ট।
আলাউদ্দিন আজারেই ১১, ৫৮ ও ৬৯ মিনিটে গোল করে হ্যাটট্রিক করেন। এছাড়া এথিয়ান গনজালেজ এবং জিথিন এমএস একটি করে গোল করেন। ফলে ৫-২ ব্যবধানে জয় পেয়ে সেমিফাইনালে ওঠে নর্থইস্ট।
কিন্তু মোহনবাগানের শক্তিশালী রক্ষণভাগের বিরুদ্ধে সেই আক্রমণাত্মক ফুটবল কাজে লাগাতে পারেনি নর্থইস্ট।
## মোহনবাগানের ফাইনালের রাস্তা
এবারের ডুরান্ড কাপে মোহনবাগানের পথও যথেষ্ট কঠিন ছিল। গ্রুপ পর্বে ভালো পারফরম্যান্সের পর কোয়ার্টার ফাইনালে জামশেদপুর এফসির বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ১-১ থাকার পর দীর্ঘ পেনাল্টি শুটআউটে ৯-৮ জয় পায় তারা।
এরপর সেমিফাইনালে নর্থইস্ট ইউনাইটেডকে হারিয়ে আবারও ফাইনালে জায়গা করে নিল দলটি।
অর্থাৎ নকআউট পর্বের দুই ম্যাচেই পেনাল্টির স্নায়ুর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে মোহনবাগান।
## সামনে কলকাতা ডার্বি
মোহনবাগানের ফাইনালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ডুরান্ড কাপের ফাইনালে তৈরি হল কাঙ্ক্ষিত কলকাতা ডার্বি। ইস্টবেঙ্গল ইতিমধ্যেই এসসি দিল্লিকে ৫-৩ ব্যবধানে টাইব্রেকারে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের ম্যাচ গোলশূন্য ছিল। এরপর পেনাল্টিতে জয় পায় লাল-হলুদ।
ফলে ২৩ আগস্ট ডুরান্ড কাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল। ২০২৬ সালের ডুরান্ড কাপের শেষ ম্যাচ যে আরও একবার কলকাতা ফুটবলের সবচেয়ে বড় দ্বৈরথের সাক্ষী হতে চলেছে, তা এখন নিশ্চিত।
## ডুরান্ড কাপে ফের মুখোমুখি দুই প্রধান
মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল একই গ্রুপে থাকায় এবারের ডুরান্ড কাপের শুরুটাই হয়েছিল ডার্বি দিয়ে। উদ্বোধনী ম্যাচে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়েছিল। এরপর টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে দুই দল আলাদা পথে এগিয়ে এবার আবার ফাইনালে মুখোমুখি হতে চলেছে।
অর্থাৎ টুর্নামেন্টের শুরুতে যে লড়াই দিয়ে ডুরান্ড কাপের উত্তেজনা শুরু হয়েছিল, শেষটাও হতে চলেছে সেই একই দ্বৈরথ দিয়ে।
## ১৮তম ডুরান্ড কাপ জয়ের হাতছানি
মোহনবাগান ডুরান্ড কাপের ইতিহাসে অন্যতম সফল দল। এবার ফাইনালে জিততে পারলে আরও একটি ট্রফি ঘরে তুলবে সবুজ-মেরুন শিবির। অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গলের সামনেও রয়েছে ঐতিহাসিক সুযোগ।
ফাইনালের আগে দুই দলের আত্মবিশ্বাসই যথেষ্ট উঁচু। মোহনবাগান যেখানে পরপর দুই নকআউট ম্যাচে টাইব্রেকার জিতে এসেছে, সেখানে ইস্টবেঙ্গলও এসসি দিল্লির বিরুদ্ধে পেনাল্টিতে জয় পেয়েছে।
## বিশাল কাইথ বনাম ইস্টবেঙ্গলের পেনাল্টি টেকাররা
ফাইনালে মোহনবাগানের বড় ভরসা হতে চলেছেন বিশাল কাইথ। নকআউট পর্বে তাঁর পেনাল্টি সেভ করার দক্ষতা ইতিমধ্যেই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জামশেদপুর ম্যাচে তাঁর সেভ এবং নর্থইস্টের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে তাঁর ভূমিকা দেখিয়েছে, চাপের মুহূর্তে কাইথ কতটা কার্যকর।
অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গলও পেনাল্টি শুটআউটের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফাইনালে উঠছে। এসসি দিল্লির বিরুদ্ধে ৫-৩ ব্যবধানে জয়ের সময় লাল-হলুদের পাঁচ শটই জালে জড়ায়, আর গোলরক্ষক প্রভসুখন সিং গিল একটি পেনাল্টি রুখে দেন।
তাই ফাইনাল পেনাল্টিতে গড়ালে গোলরক্ষকদের লড়াইও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
## ২৩ আগস্টের অপেক্ষা
ডুরান্ড কাপের ১৩৫তম সংস্করণের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ২৩ আগস্ট। এবারের টুর্নামেন্টে ২৪টি দল অংশ নিয়েছিল এবং ফাইনাল হবে সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে।
ফাইনালে একদিকে মোহনবাগান, অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গল। দুই দলের সমর্থকদের কাছে এর চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী-ই বা হতে পারে!
## শেষ কথা
নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ৯০ মিনিটের পর পেনাল্টি শুটআউটে ৪-৩ জয় পেল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। আবারও দলের ত্রাতা হয়ে উঠলেন গোলরক্ষক বিশাল কাইথ। এই জয়ের ফলে ফাইনালে পৌঁছে গেল সবুজ-মেরুন।
আর ফাইনালে অপেক্ষা করছে ইস্টবেঙ্গল। অর্থাৎ ডুরান্ড কাপের ট্রফির জন্য এবার লড়াই হবে কলকাতার দুই প্রধানের মধ্যে। শুরুতেই ডার্বি, শেষেও ডার্বি—এবারের ডুরান্ড কাপের চিত্রনাট্য যেন কলকাতা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য একেবারে আদর্শ হয়ে উঠল।


