পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, বিধাননগর হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে প্রখ্যাত চিকিৎসক, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের নামে রাখা হবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে রাজ্যের চিকিৎসা ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ও মৃত্যু—দুটিই ১ জুলাই হওয়ায়, জাতীয় চিকিৎসক দিবসের তাৎপর্যও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় শুধু একজন সফল চিকিৎসকই ছিলেন না, তিনি আধুনিক পশ্চিমবঙ্গ গঠনের অন্যতম প্রধান স্থপতি। তাঁর হাত ধরেই কলকাতার উপকণ্ঠে পরিকল্পিত নগর হিসেবে বিধাননগর (সল্টলেক), কল্যাণী, দুর্গাপুর-সহ একাধিক শহরের বিকাশ ঘটে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। সেই কারণেই তাঁর স্মৃতিকে আরও স্থায়ীভাবে সম্মান জানাতে বিধাননগর হাসপাতালের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, হাসপাতালের নাম পরিবর্তন শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নয়, বরং চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত নতুন প্রজন্মকে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের আদর্শ ও কর্মজীবন সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করার একটি প্রচেষ্টা। তাঁর জীবনদর্শন ছিল মানুষের সেবা এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদের একজন হিসেবে পরিচিত। তিনি চিকিৎসা শিক্ষার উন্নয়ন, হাসপাতাল নির্মাণ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করে তিনি শিল্প, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রে একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, হাসপাতালের নাম পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বাস্থ্য পরিষেবার ইতিহাস এবং চিকিৎসকদের অবদান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে। বিশেষ করে তরুণ চিকিৎসক ও মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের কাছে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের কর্মজীবন একটি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক মহলেও এই ঘোষণাকে ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও, আবার কেউ স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর আরও উন্নয়নের দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিষেবা, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং রোগীদের জন্য আরও উন্নত পরিষেবা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি।
সাধারণ মানুষের একাংশও এই ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের মতে, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মতো একজন কিংবদন্তি চিকিৎসকের নামে হাসপাতালের নামকরণ যথাযথ সম্মান প্রদর্শনেরই একটি অংশ। একইসঙ্গে তাঁরা আশা করছেন, নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি হাসপাতালের অবকাঠামো ও পরিষেবারও আরও উন্নতি ঘটবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যাঁরা ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন, তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের নামের সঙ্গে যুক্ত এই হাসপাতাল আগামী দিনে আরও উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের মাধ্যমে তাঁর আদর্শকে বাস্তব রূপ দেবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্বাস্থ্য মহলের।


