কলকাতার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ইএম বাইপাস সংলগ্ন জলাভূমি এলাকাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কুণাল ঘোষ সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে বাইপাসের ধারে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির একাংশ বেআইনিভাবে ভরাট করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই পরিবেশপ্রেমী মহল, প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
পূর্ব কলকাতার জলাভূমি অঞ্চল শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে পরিচিত। এই জলাভূমি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং দীর্ঘদিন ধরে কলকরার প্রাকৃতিক বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে আসছে। এছাড়াও এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যচাষ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে জলাভূমির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই ধরনের কোনও ভরাট বা দখলদারি কার্যকলাপের অভিযোগ সামনে এলে তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কুণাল ঘোষের দাবি, ইএম বাইপাস সংলগ্ন একটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে মাটি ফেলে জলাশয় ও নিম্নভূমি ভরাট করা হচ্ছে। তাঁর মতে, যদি অভিযোগ সত্যি হয় তাহলে এটি শুধু পরিবেশ আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং ভবিষ্যতে কলকাতার পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
এই অভিযোগের পর পরিবেশবিদদের একাংশও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে দ্রুত নগরায়নের ফলে জলাভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে আসছে। বহু ক্ষেত্রে আবাসন প্রকল্প, বাণিজ্যিক নির্মাণ কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক জলাধার ও নিম্নভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে বর্ষাকালে জল জমার সমস্যা বাড়ছে, ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাভূমি শুধু একটি জলাশয় নয়। এটি প্রাকৃতিক স্পঞ্জের মতো কাজ করে, অতিরিক্ত বৃষ্টির জল ধারণ করে এবং বন্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বহু প্রজাতির পাখি, মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও জলাভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে এই ধরনের এলাকা ভরাট হয়ে গেলে পরিবেশগত ক্ষতি অনেকাংশেই স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। তবে সূত্রের খবর, অভিযোগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে আনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। যদি তদন্ত শুরু হয়, তাহলে জমির নথি, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট নির্মাণ কার্যকলাপের বৈধতা খতিয়ে দেখা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলিও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্নে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুলেছে। অনেকের মতে, পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে রাজনৈতিক রং না দিয়ে তথ্যভিত্তিক তদন্ত হওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে কোনও বেআইনি ভরাট হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
কলকাতার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং নগর সম্প্রসারণের চাপে উন্নয়নমূলক প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনই পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিতর্ক সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে, ইএম বাইপাস সংলগ্ন জলাভূমি ভরাটের অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি স্থানীয় ইস্যু নয়। এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, নগর পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার মতো বৃহত্তর বিষয়গুলিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন সকলের নজর থাকবে প্রশাসন তদন্তের পথে এগোয় কি না এবং অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রমাণিত হয় তার ওপর।


